প্রথম আলাপ

প্রথম আলাপ

মেয়েটি কিন্তু বসে ই ছিল তখন, মন থেকে মানতেই পারছিলনা যে সে বউ হয়ে গে। উফফ সত্যিই কি আমি বউ? হঠাত করেই আয়নায় গিয়ে চুল উল্টো  পাল্টা করে সিঁদুরের দিকে তাকিয়ে আছি।কপালে লাল টিপ, সিঁথি তে লাল সিঁদূর আর পরনে লাল হলুদ শাড়ি আর ঠোঁটের কোনে লজ্জা মেশানো আলতো হাসি। উফ আমি শাড়ি পড়ে ভাবতেই পারছিনা সারাটা জীবন তো জিন্স পড়েই কাটিয়ে দিলাম।আরে ওটাকে কে?কে উকি মারছে ওখানে?আরে পালিয়ে গেল তো।খুব লজ্জা লাগছে নিজের দিকে তাকাতে।কিন্তু আমার সেই ক্যাবলাকান্ত পতিদেব কোথায়?খুব ভয় করছে আমার।বাবা মায়ের ওপর ভীষণ রাগ হচ্ছে এটা ভেবে যে একটা অচেনা মানুষের সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিল?উফ বুঝতেই পারছি না যে এখন কি করবো?নিজেকে খুব একা লাগছে, অসহায় লাগছে- ছোটবেলা থেকেই এই বিয়েটাকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিলাম কিন্তু হলো কি?এত তাড়াহুড়ো করে বিয়েটা হয়ে গেল যে বিয়ের আগে মানুষটার সাথে একটু গল্প পর্যন্ত করতে পারলাম না,গল্প তো দূরের কথা একটু ভালো করে আলাপ  পর্যন্ত হলো না।আচ্ছা এই প্রথম রাতেই এসে কি পুরুষত্ব ফলাবে আমার ওপর?উফ আমি আর ভাবতে পারছি না।দরজায় মনে হলো খট করে আওয়াজ শুনতে পেলাম- ঐতো ক্যাবলাকান্ত টা আসছে মনে হয়।ওরে বাবা দেখেই তো আমার হাত পা কাপছে।কিন্তু ওর হাতে ওটা কি? পিছনে হাত লুকানো কেন?এ বাবা ও তো পুরো কাক ভেজা হয়ে ফিরেছে,আমি এখন কি করবো কিছু বুঝতে পারছিনা।আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনি এতো ভিজে গেলেন কি করে?আপনি বলাতে কি আমার দিকে কেমন বিস্ময়ের চোখে তাকালো?আমিও থতমত খেয়ে বললাম-মানে তুমি ভিজলে কি করে এত?তারপর হঠাৎ আমার চোখ গেল রেপারিং কাগজটার দিকে,মনে কৌতুহল হচ্ছে যে ওটা কি?ওটা কি আমার জন্য কিছু?এইসব ছাইপাশ ভাবতে ভাবতেই দেখি সে ফ্রেশ হয়ে আমার সামনে এসে বসলো।ওরে বাবা এবার আমি কি করবো কি করা উচিত আমার?আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার হাতে এক গুচ্ছ গোলাপ ফুল দিল খানিকটা সময় আমার বোঝা না বোঝার মধ্যে কেটে গেল এটা ভেবে যে ও কি করে জানল আমার প্রিয় ফুল গোলাপ তাও আবার হলুদ।সেটা জিজ্ঞেস করতে যেই যাব অমনি সাথে সাথে আমাকে বলল যাও অনেক রাত হয়েছে ফ্রেশ হয়ে হালকা কোন ক্যাজুয়াল ড্রেস পড়ে নাও যেটাতে তুমি কম্ফর্ট হও।শুনে মনে মনে খানিকটা হাসলাম আর ভাবলাম মানুষটা খুব একটা খারাপ নয়।আমি 7 থেকে 10 মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে অনেক উত্তেজনা নিয়ে খাটে এসে বসলাম ,জানলার  বাইরে থেকে দেখতে পেলাম তখনও বৃষ্টি পরছে।এবার মনে হচ্ছে আমার একটু ভয় কেটেছে,লোকটাকে যতটা খারাপ ভেবেছিলাম ততটা খারাপ নয়।খাটে বসতে না বসতেই আমাকে দু মিনিটের মধ্যে বলছে এই দুই তিন দিন অনেকটা স্ট্রেস গেছে এবার চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ো- আমি শুনে অবাক হয়ে গেলাম আর তার থেকেও বেশি রাগ হতে শুরু করল।সিরিয়াল সিনেমা দেখে মনের মধ্যে ফুলশয্যার রাত টা কে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম কিন্তু সব আগুনে জল ঢেলে দিল?--আমিও কিছু না বলে রাগ হয়ে দেয়ালের দিকে ফিরে শুয়ে রাগে গজ গজ করতে করতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি ঠিক জানিনাহঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে দেখি সে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।আমার জেগে জাগাতে হঠাৎ খানিকটা থতমত খেয়ে গেল।আমি জিজ্ঞেস করলাম তুমি এখনো ঘুমাওনি?বলল- না,প্রথম রাতে অন্তত তোমার দিকে তাকিয়ে তোমাকে মুখস্ত করে নিই।শুনেই আমি খানিকটা আলতো হেসে পুরো বরফের মত গলে গেলাম।আমিও একটু রোমান্টিক ভাবে বললাম সারাটা জীবন তো এই মুখটা দেখেই এমনি মুখস্থ হয়ে যাবে।এখন ঘুমাও, ও বলল- না।আমিও খানিকটা জোরে শাসনের মতো করে ধমক দিয়ে ঘুমাও বলতেই ভয় চোখ বন্ধ করে দিল,মনে মনে খুব হাসি পেল কিন্তু তার থেকেও ভালোলাগাটা অনেক বেশি তৈরি হল ওর প্রতি।কিন্তু এরপর ও ঘুমিয়ে পড়লেও সারারাত আমার ঘুম আসলো না।মনে হতে লাগল যে জীবনে একটা ভালো বন্ধু পেয়েছি। জানিনা হাসবেন্ড হিসাবে কতটা ভালো হবে কিন্তু ভালো বন্ধু পেয়েছি এটাই বা কম কিসের।ভোরের দিকে মাঝে মাঝে মনে মনে ভাব আমাকে থ্যাঙ্কস জানাতে ইচ্ছা করছিল।একদম ভোরের দিকে চোখটা লেগে এসেছিল হঠাৎ আটটার সময় আমার ঘুমটা ভাঙলো "কফিটা খেয়ে নাও" এই আওয়াজে।সকালটা যেন খুব সুন্দর ভাবে শুরু হলো অনেকদিন পর এরকম একটা সকাল আমি শুরু করলাম,সকাল বললে ভুল হবে হয়তো শুরুটা হয়েছিল নতুন জীবনের নতুন সংসারের।এভাবেই এই বোকা বোকা আলাপের মাধ্যমে আমাদের নতুন জীবনের সূচনা হয়েছিল।এখন আট বছর পর ভাবলে ভালো লাগে যে সেই ভয় থেকে,সেই অসহায়তার থেকে যে জীবন শুরু হয়েছিল তার রেশ এখনো কেটে চলেছে।