পরিণতি

পরিণতি

13 বছর পর কলেজের  রিইউনিয়নে এসে মনটা বেশ ঝরঝরে লাগছিল নিওনের।চোখ বুলিয়ে শুধু পুরনো কলেজ টাকে দেখছিল -কত পরিবর্তন হয়ে গেছে কলেজ টা। এইখানে সাইকেল গ্যারেজ তাতে আগে সাইকেল রাখার নিয়ে মারামারি কিন্তু আজ মাত্র এই কটা সাইকেল আছে।আজ শুধু সাদা কালো লাল নীল সবুজ বাইক আর স্কুটি। আমাদের ডিপার্টমেন্টে বেশ সাজিয়েছে-রঙিন বেলুন আর কাগজে বেশ প্রাণবন্ত লাগছে নিষ্প্রাণ ইকোনমিক্স ডিপার্টমেন্ট টা।কত স্মৃতি এই রুমগুলোতে ,সেই জানলাটা যেখান থেকে লেডিস কমনরুম এর প্রতিটি কোন দেখা যেত, আজও দেখা যায় সবই শুধু একটাই পরিবর্তন তখন জানলার কাঁচটা ভাঙ্গা ছিল আজ সেই টা চকচক করছে।তারপর চোখ গেল পিছনের দিকের বেঞ্চ গুলোর দিকে -,কত স্মৃতি গুলোকে নিয়ে লুকিয়ে স্মোক করা বেঞ্চে ছবি আঁকা, মুখ লুকিয়ে মেয়ে দেখা,শাস্তি পাওয়া আরো কত কি দুষ্টুমি -এসব ভাবতে একটা আলতো হাসি এল নিওনের। কতটা ম্যাচিওর হয়ে গেছে তারা। এবার নিওনের চোখ গেল পরিচিত মানুষগুলোর দিকে সবাই কালো আর লাল পোশাকে বেশ ভালই লাগছে।কিন্তু নিওনের আজও চোখ খুঁজে তিতিরকে ।নিয়ন ভাবছে তিথির কি আসেনি? তিথির রিইউনিয়নের ব্যাপারটা জানে না? কিন্তু সহেলি প্রিয়াঙ্কা এসেছে তাহলে তো তিতিরের ও আসার কথা। কাউকে জিজ্ঞাসা করতেও কুন্ঠিত বোধ হচ্ছে আবার নিজের কৌতুহল চাপতে পারছিনা নিওন।সবার সাথে হারিয়ে গেল পর্ব সারার পর নবীন এনাউন্স করল মোটামুটি সবাই এসে গেছে এবার কেক কাটার পালা, কিন্তু নিওনের শুধু মনে হচ্ছে ওর আসাটাই বুঝি ব্যর্থ হয়ে গেল। কেক কাটা শুরু হবে সেই মুহূর্তে ঠিক দরজার সামনে থেকে একটা মিস্টি গলার আওয়াজ ভেসে এলো "আমাকে ছাড়াই বুঝি তোরা কেক কেটে ফেলবি?"নিওনের চোখ ঠিক এক মাইক্রো সেকেন্ডের মধ্যে রুমের দরজায় গেল। খোলা চুলে কালো শাড়ি লাল ব্লাউজ তিতিরকে কি অপরূপ লাগছে। তিতিরের ফিগারটা সেই আগের মতনই আছে কিন্তু আগের থেকে অনেক বেশি স্মার্ট হয়ে গেছে। তিতির ওর দিকেই।খুব সুন্দরি না হলেও তিতিরের মধ্যে একটা বেশ আকর্ষণ আছে ।কালো শাড়িতে বেশ মানিয়েছে ওকে ।কলেজের প্রথম দিন টার কথা মনে পড়ে গেল নিওনের।আকাশী রঙের একটি ফুলহাতা লং টপ আর কালো জিন্স পড়ে কি অসাধারণ ভাবে ক্লাসে ঢুকে ছিল তিতির,সারা ক্লাস চেয়েছিল ওর দিকে, তবে এটাও ঠিক নিয়ন কিন্তু খুব সুন্দর ছিল। বেশ কিছুদিনের মধ্যেই ওদের বন্ধুত্বটা খুব জমে গিয়েছিল কারণ ওরা দুজনেই খুব ভালো টেবিল টেনিস খেলে ।সেই ভাঙ্গা জানালা দিয়েই অপলোক দৃষ্টিতে তিতিরের খেলা দেখতে দেখতেই হয়তো প্রেমে পড়ে গিয়েছিল নিয়ন। তিতির অবশ্য সবটাই বুঝতে পারতো কারন প্রিয়াঙ্কা সহেলীসারাক্ষণ এই নিয়েই টিচ করে চলত তিতির কে।সেকেন্ড পেপারের ম্যাথ গুলো নিওনের কাছে শিখতে চেয়েছিল তিতির,সেই অংক যে প্রেম সাহিত্যে পরিণত হবে তিতির বুঝতে পারেনি। দু'বছর তারা চুটিয়ে প্রেম করেছিল,তৃতীয় বর্ষের শুরুতে তিতিরের বাড়ি থেকে জানাজানি হয়ে যাওয়ায় তিতিরএর কলেজে আসা প্রায় বন্ধ হয়ে যায় ।ওদের দেখা কথা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওরা দুজনেই প্রায় পাগল হয়ে একটা দুঃসাহসিক ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেকাউকে না জানিয়ে তারা একটি কালী মন্দিরে বিয়ে করে ফেলে।নিয়ন আজ ভাবছে কি পাগলামি না করেছিল সেদিন।কিন্তু সেই বয়সে এর থেকে বেশি ভাবতে পারছিল না ওরা,ওরা ভেবেছিল বিয়েটাই হয়তো দুজনের একসাথে থাকার চাবিকাঠি।কিন্তু শেষ রক্ষা হল না।তিতিরের বাবা ক্ষমতাশালী লোক হওয়ায় তিতিরকে আলাদা হতে হয়েছিল নিওনের থেকে।তারপর আর কখনো তিতির কলেজে আসেনি, ওর ফোন নাম্বারটাও সুইচ অফ পাওয়া যেত।নিয়ন ওকে শেষ দেখেছিল অনার্স পেপার এর পরীক্ষার দিন।তারপর কেউ কাউকে আর খুঁজে পায়নি ।আজ আবার এতদিন পর মিলন তিথির কে দেখার জন্য সুদূর আমেরিকা থেকে পুরনো কলেজে ফিরে এসেছে।খুব কথা বলতে ইচ্ছে করছে নিয়নের। দুজনেই দুজনকে সবার চোখ এড়িয়ে দেখছে কিন্তু কিছু বলতে পারছে না।নিওনের মনের মধ্যে হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।হয়তো দুজনে দুজনকে কিছু বলতে চাইছে কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সব কথাই যেন ফুরিয়ে গেছে।ভয় সঙ্কোচ বোধ এই দুটোই যেন নিয়নকে তীব্র তাড়া করে বেড়াচ্ছে।কিন্তু আজও যে কিছু বলার আছে নিয়নের।নিয়ন মন থেকে বলতে চাই সেটি দিনের জন্য আজও অপেক্ষা করে আছে।সে আজওভাবে যে তারা স্বামী স্ত্রী। হঠাত সব আশা শেষ হয়ে গেল  এটা ভেবে  যে তিতির কাউকে জীবনসঙ্গী বেছে নেইনি তো? অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক, তার জন্য একবারও নিয়ন তিতির কে দোষ দেয় না কারণ সে বাস্তবটা বো।  সে বোঝে এত বছর অপেক্ষা করে থাকা কোন মেয়ের পক্ষে সম্ভব না।তিতিরের ও মনের মধ্যে অনেক কথা জমে আছে সেটা তিতিরের মুখের দিকে তাকালেই পরিষ্কার বুঝে যাওয়া যায়,কিন্তু কি বলবে তিতির সেটা নিজেই বুঝে উঠতে পারছিল না তিতির।এটা ভেবেই পারছিল না যে এখনো তিতিরের বুকের ভেতরে কেন ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে।দুজনের মনের মধ্যে যেন চরম ঝড় উঠলো,কিন্তু একি কেউই যে কারো সাথে কথা বলতে আসছে না।তিতির কিছু বলতে যাওয়ার আগেই ভাবছে যে- বলে কি লাভ নিয়ন হয়তো এখন সুখে ঘর সংসার করছে।নিওন হঠাত লক্ষ্য করলো যে তিতিরের সারা শরীরে বিবাহিতের কোন চিহ্নই নেই।মন কিছুটা আশ্বস্ত হলো কিন্তু আবার এটাও ভাবল আজকাল কোনো মেয়েকে দেখেই তো বোঝা যায় না সে অবিবাহিত না বিবাহিত আর তিতির তো  আলাদা ই,এত স্মার্ট একটা মেয়ে।হঠাৎ একটা এনাউন্সমেন্ট শোনা গেল-একটা স্পেশাল কেক আছে যেটা শুধু তিতির আর নিয়ন কাটবে,ওরা দুজনেই তো খুব অবাক হয়ে গেল, দুজনে খুব আপত্তি জানালো কিন্তু শেষমেশ দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে রাজি হয়ে গেল।ঠিক 14 বছর পর দুজন দুজনকে ছুয়ে কেক কাটছে।নিওনের শরীরে যেন হঠাৎ ইলেকট্রিক শক লাগছে আর তিতিরের হাত-পা কাঁপছে।কেক কেটে ওরা বোকার মত সবার দিকে তাকিয়ে রইল সবাই একসাথে চিৎকার করে বলছে খাইয়ে দে খাইয়ে দে।তিতির কাঁদতে কাঁদতে নিয়ন কেক একটা খাইয়ে  দিল।সবাই এত জোরে হাততালি দিলো যে আনন্দে দুজনে খিল খিল করে হেসে উঠল।হঠাৎ কোথা থেকে ডোনা দুটো রজনীগন্ধার মালা এনে দুজনের হাতে দিল, পড়িয়ে দিতে দুজন দুজনকে আর কত অপেক্ষা করবি তোরা?নিয়ন আর তিতির যেন অবাক হয়ে যাচ্ছে কি হচ্ছে এসব?এগুলো কি ওরা আগে থেকে প্ল্যান করে রেখেছে?নিয়ন ভাবছে তাহলে তিতির কি এখনো সিঙ্গেল আছে?তিতিরও  অবশ্য ঠিক সেটাই ভাবছে।হাতে ক্যামেরা নিয়ে সবাই চিৎকার করে উঠল কিরে পড়া মালা,আমরাতো ফটো তুলব।কাঁদতে কাঁদতে তৃপ্ত মন দুটো দুজনকে মালা পরালো।উফ কি খুশি যে ওরা দুজন হয়েছে সে কি বলবো।সবাই খুব জোরে হাততালি দিলো কিন্তু শেষে এনাউন্স হল বিয়ে খাওয়াটা তো পরে খাবো কিন্তু মালাবদলের খাওয়ানোটা আজ কিন্তু তোদের দু'জনকেই খাওয়াতে হবে।নিয়ন আর থাকতে না পেরে তিতিরকে বুকে জড়িয়ে বলল আজ সব খাওয়ানোটা আমি খাওয়াবো।এবার তিতির আর নিয়ন দুজনেই চিৎকার করে সবাইকে থ্যাংকস জানানো ওদের মিলনের জন্য।বন্ধুরা ওদের মিলনের জন্য এত কিছু করেছে সেটা ওরা দুজনে ভাবতেই পারছে না।কি যে আনন্দ হচ্ছে ওদের ওরা বলে বোঝাতে পারবে না।এতটা সারপ্রাইজ ওদের জন্য ওয়েট করছিল ওরা বুঝতেই পারেনি।ওদের ভালোবাসার পরিণতি আর অপেক্ষা যে এত মধুর হবে স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।এরপর 10 ই মার্চ তারা দুজনে বিয়ে করল,এবার কিন্তু বাড়িতে না জানিয়ে নয় ,বাড়ির সকলকে নিয়ে তারা নতুন জীবন শুরু করলো।