সময়ের ব্যবধান

সময়ের ব্যবধান

জানলার সামনে থেকে পাহাড়ের চূড়া টা বেশ স্পষ্টই দেখা যায়,শীতকালে অবশ্য এর সভা অবর্ণনীয়.. বরফের ওপর সূর্যের আলো পড়ে পাহাড়ের চূড়া টা যেন হীরার মত চকচক করে।মিরা পাহাড় দেখতে খুব ভালবাসে বলেই নয়ন ট্রান্সফার টা নর্থ বেঙ্গলে নিয়েছিল। তার জন্য অবশ্য মীরার প্রাইভেট স্কুলের পড়ানো  ছেড়ে দিতে হয়েছিল তাতে অবশ্য মীরার কোন কষ্টই নেই।ওরা দুজনেই সব ভেবেচিন্তেই বাড়ি ছেড়ে এখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ।তাতে নাকি দুজনের মধ্যে বন্ডিংটা অটুট তৈরি হবে আর বাড়ির সাথে সম্পর্ক টাও ভালো থাকবে ,বাড়তি কোনো ঝামেলা পোহাতে হবে না ওদেরকে।রোজকার মত আজও জানলা দিয়ে বাইরের পাহাড়টা দেখছে মিরা।আজ অবশ্য মেঘে ঢাকা পাহাড়টা বেশ অস্পষ্ট লাগছে তবুও প্রতিদিনের মতোই বিকেলের উত্তরে জানলার গ্রিল ধরে পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে আছে।তার মনে হচ্ছে ঘরের ঝুল ঝাড়ু টা এনে মেঘগুলোকে সরিয়ে পাহাড়ের সুন্দর মুখটা দেখতে ,কিন্তু প্রকৃতিকে পরিবর্তনের সাধ্য তার নেই। ভাসমান মেঘগুলোর দিকে তাকিয়েই মিরা নয়নের ভালো থাকার কথাগুলো ভাবছে।এখানে এসে অনেক কষ্ট করে নতুন বাড়ি কেনা নতুন সংসার গোছানোর স্বপ্ন নয়ন কে না জানিয়ে টিউশন করে কিছুটা সেভিংস করা।সেই দিনটার কথা ভাবলে হাসি পায় হঠাৎ করে অফিস থেকে ফিরে মীরাকে ছাত্র-ছাত্রীসহ দেখে চিৎকার করে ওঠা আর সবকিছুর কারন জানতে পেরে নিজেকে জড়িয়ে ধরা।আর সেই দিনটা ?যেদিন নয়নকে জড়িয়ে ধরে জানিয়েছিলাম আমাদের সংসারে নতুন অতিথির কথা। সেই দিনটা এত খুশি হয়েছিল তা বলে বোঝানো যায় না। ওই মাসগুলোতে নয়ন যা করত আমার আর ওর বেবির জন্য মনে হতো বোধহয় বিশ্বের একমাত্র বাবা।আর তিনি যেদিন জন্মানোর সেদিন তোর মেয়ের খুশিতে সারা পাড়া কে মিষ্টি খাইয়ে ছিল।মন্দিরের ঢং ঢং আওয়াজ মীরার কানে এল, এই রে সন্দেহ এসেছে ঘরে মশা ঢুকতে শুরু করেছে জানলাটা বন্ধ করলো মীরা।আবার শুরু হল সেই একাকীত্বতা।নয়নের সাথে ডিভোর্সের পর জীবনটা খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগে মিরার, যদিও সে কোন দোষ দেয় না নয়নকে। নিজের বোকামী কে দোষ দেয়, সেই দিন যদি কলকাতা ছাড়া জেদ না করতো তাহলে নর্থ বেঙ্গলে ওদের থাকতে হতো না আর কলকাতায় থাকলে হয়তো নয়ন চক্ষুলজ্জা বিসর্জন দিতে পারত না।উফ বোধহয় চারদিন হলো তিন্নি ফোন করেনি, ওকে ফোন করতেও বেশ সংকোচ বোধ হয়। সন্তান বড় হয়ে গেলে, বিশেষ করে স্বাবলম্বী হয়ে গেলে এটাই হয়তো হয়। সময় যে কত কিছু পাল্টে দেয় তার জলজ্যান্ত প্রমাণ মিরা।তিন্নিকে বুকে করে বড় করা ,সংসারের সব কাজ করে  একটু সময় পেত না। আর আজ? সময় যেন মিরাকে গিলে খায় তারপর একটা সময় 100 টাকা জমানোর জন্য কত কি করতো মিরা?আজ ব্যাংক ভর্তি টাকা খরচের খাত নেই -একেই হয়তো সময় বলে।আর এই সময়ের জন্যই হয়তো মীরার জীবন থেকে ধীরে ধীরে নয়ন দূরে সরতে থাকে ।বড়মা সন্ধ্যা তো   হয়ে গেল তোমার জন্য একটু চিড়া  ভাজবো এসে জিজ্ঞেস করল মীরার কাজের মেয়েটা। মীরা অনেকক্ষণচুপ থেকে উত্তর দিল -।না রে দুটো রুটি করে তুই বাড়ি চলে যা আমি দুধ টা গরম করে নিতে পারব, বলেই মিরা পা টান করে খাটে বসল, উফ হাটুর ব্যাথা টা বড্ড বেড়েছে অবশ্য হাঁটুর দোষ কি?একটা সময় তো হাঁটুকে কম পরিশ্রম করতে হয়নি? আজ সে সব ভাবলে বুকটা হু হু করে সবাইকে হারানোর যন্ত্রণায়।তখনি তিন্নির সেই প্রথম স্কুলে দিনটার কথা মনে পড়ে গেল মীরার -কি কেঁদেছিল তিন্নি, যখন ক্লাস টিচার তিন্নিকে জোর করে মায়ের হাত ছাড়িয়ে ক্লাসে নিয়ে গেল। আর আজ তিন্নিকে ছুঁতে চাইলেও ছুঁতে পারে না মিরা ভাবতে ভাবতেই চোখের কোনে জল এসে গেল।যাইহোক তিন্নি এখন স্বাবলম্বী হয়েছে, ওতো  এখন বড় চাকরি করছে -মা হিসেবে মীরার জীবন পরিশ্রম সার্থক হয়েছে।তিন্নির স্কুলে যাতায়াত, পড়ানো, গান শেখানো, আঁকানো, ক্যারাটে ক্লাসে নিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলো কিভাবে কেটে।ওর পেছনে একটু সময় দিতে গিয়েই তো নয়নের থেকে একটু একটু করে দূরে সরে গিয়েছে মীরা।তাই জন্যই তো নয়ন রুপ্সার কাছে ধীরে ধীরে যেতে পেরেছে। কখন যে মিরা নয়নের মন থেকে সরে গিয়ে সেই স্থানটি রুপ্সা দখল করে নিয়েছে মিরা সেটা নিজেও বুঝতে পারেনি।রুপ্সা মীরার কাকাতো বোন ,কাকা মারা যাবার পর মন ভালো করার জন্য মীরা দুমাসের জন্য নর্থ বেঙ্গল এনেছিল রুপ্সা কে।ক্ষমতা আছে মেয়েটার না হলে কি মাত্র দু মাস সময়ে 6 বছরের বিবাহিত জীবন চার বছরের সন্তানকে ভুলিয়ে ডিভোর্সের পরিণত করতে পারে?সেই দিনটা যেদিন  নয়ন সে মিরাকে ছেড়ে গিয়েছিল সেদিন টার কথা ভাবলে আজও মিরার বুকটা ভেঙে যায়।তিন্নিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছিল কিন্তু সময় সেখান থেকেও দূরে সরিয়ে দিয়েছে মিরাকে। তিন্নি আজ খুব ব্যস্ত মাকে আলাদা করে সময় দেয়ার মত সময় তার আজ নেই। মিরা তাই এখন নিজেকেই দোষ দেয় সে বিয়ের পর যদি নিজেদের দুজনের কথা না ভেবে, নর্থ বেঙ্গলে না এসে পরিবারকে একটু সময় দিত তাহলে হয়তো মিরাকে আজ সময় এর হাতছানিতে পা দিতে হতো না ।এই "সময় " নামক জিনিসটা মীরার জীবন থেকে সবকিছু কেড়ে নিতে পারত না।মিরা এখন সব সময় ভাবে সময়ের কাজ সময়ে মতো করা উচিত না হলে হয়তো মিরার মতোই প্রত্যেকটা মানুষকে সময়ের ব্যবধানে সব কিছু হারিয়ে ফেলতে হয়।