টানাপোড়েন

টানাপোড়েন

ধূমপান স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর জানা সত্ত্বেও সুমন অফিস থেকে ফেরার পর একটার পর একটা সিগারেট ধরিয়ে যাচ্ছে।হঠাৎ সুমনের কলেজে দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল -মিতালী সিগারেট দেখলেই ছুড়ে ফেলে দিত। আর সেবার তো বারণ করা সত্তেও স্মোক করেছিল দেখে মিতালী 11 দিন ওর সাথে কথা বলে নি, কিন্তু আজ?আজ আর মিতালী ফিরেও দেখেনা এস্ট্রেতে কতগুলো সিগারেট বা ছাই জমেছে। কি করবে না ভাবতে পেরে সুমন মোবাইলে গেম চালু করল আর অন্য হাতে আবার নতুন একটা সিগারেট কিন্তু কিছুতেই সুমন কনসেনট্রেট করতে পারছেনা গেমে।ভাবছে মাত্র এক বছর সাত মাস তো হলো বিয়ের তাতেই......?উফ আবার সেই চিৎকার কানটা ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে সুমনের। চাকরিতে জয়েন করার পর থেকেই সুমনের বাড়ি আসার তাড়াহুড়ো ছিল খুব, অবশ্য তার কারণ ছিল মিতালীকে সময় দেওয়া কিন্তু এই এক বছর ধরে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না সুমনেরএই এক বছরে কি করে যে দীর্ঘ ছয় বছরের ভালোবাসার জীবনটার প্রতি অবহেলা জমে যাচ্ছে সুমন তা বোঝেই না। মায়ের গলা তো পাচ্ছি না,তাহলে কি মা চুপ করে  গোমরা মুখে বসে আছে? আজ রাতেও কি খাবে না মা?উফ আর পারছে না সুমন।সুমনের অফিসের অমিতদার সাজেশন টা মনে পড়ল সুমনের ।সেদিন সুমনের সব কথা শুনে অমিত দা বলেছিল "যা ভাই বউ আর মাকে নিয়ে কোনো ভালো জায়গা থেকে ঘুরে আয়" কিন্তু ভবেশ দার  অভিজ্ঞতা অনেক বেশি তাই ভবেশ দা বলেছিল "সুমন এবার তোমরা একটা বেবি নেওয়ার কথা ভাবো"।অনেকে অনেক মতামত ই সুমনকে দেয়। কিন্তু পকেটের যা অবস্থা তাতে তো সংসার মেন্টেন করাই চাপ হয়ে যাচ্ছে- মিতালীর কাছে প্রায়ই শুনতে হয় ওর এই কসমেটিক্স নে,ওটা ফুরিয়ে গেছে... তারপর আবার ঘুরতে যাওয়া?আর বেবি চেষ্টাও সুমন কম করেনি কিন্তু মিতালী কিছুতেই রাজি হচ্ছে না ।আচ্ছা সুমন কি এই ছোট্ট বাড়িতে বড় হয়নি? তাহলে ওর বেবি কেন বড় হতে পারবে না এখানে? মিতালী সেই এক জেদ ধরে বসে আছে একটা বেবির জন্য নাকি এই বাড়িটা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।একটা সময় তো এই বাড়িতে আসার জন্যই পাগল ছিল মিতালী। কিন্তু আজ এতটা পাল্টে গেল কি করে? এই বাড়ি থেকে বেরিয়ে শুধু ফ্ল্যাট কেনার আকাঙ্ক্ষা এখন ওর। মনে মনে অবাক হচ্ছে সুমন এটা ভেবে যে মানুষ যখন যেটা পায় তখন সেটা পাওয়ার ব্যাকুলতা থাকে খুব আর সেটা পেয়ে গেলে সেটাকে ধরে রাখার চেষ্টায় চলে যায় মানুষের,সেটার প্রতি অবহেলা মানুষের ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে।এইসব ছাইপাশ ভাবতে ভাবতেই মিতালী ডাকলো সুমনকে খেতে আসতে। সুমন টেবিলে গিয়ে দেখল মা নেই। মিতালীকে বলল মায়ের খাওয়া হয়ে গেছে? সুমনের মুখে মায়ের কথা শুনে সাপের মতো ফোঁস করে মিতালি উত্তর দিলো অতই যদি আদিখ্যেতা থাকে  তাহলে  মাকে খাইয়ে দিয়ে এসো।সুমন চুপ করে মাথা নিচু করে রুটিটা ছিড়তে ছিড়তে ভাবছে- মা কি করে এত পাল্টে গেল? মিতালীকে বউ করার ইচ্ছে হতো মায়ের অনেক বছর আগে থেকেই ছিল। তাছাড়া বিয়ের আগে মিতালী যখন দু একবারে বাড়িতে আসত কত যত্ন করতো মা ওকে। আর এখন মিতালীর কোন কথাই যেন শুনতে পারে না মা।বিয়ের প্রথম প্রথম যখন পাড়ার লোকেরা নতুন বউকে দেখতে এসে মিতালী রূপের প্রশংসা করত তখন মা কি খুশি হতো ,আর আজ মিতালি একটু সাজগোজ করে থাকলে মা মিতালীকে কথা শোনায়। এসব ভাবতে ভাবতেই সুমন খাওয়া শেষ করে হাত ধুতে গেল ,তখনই সুমনের মনে হল জিজ্ঞেস করা হয়নি খেয়েছে কিনা?ওহো আজ রাতে মিতালী আবার ঝগড়া করবে বোধহয় সুমনের সাথে, মায়ের কথা জিজ্ঞেস করল অথচ বউয়ের কথা জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছে? অফ কি যে করবে সুমন এখন ভাবতেই পারছে না?সাথে সাথেই ঘরে ঢুকে মিতালী সপাটে দরজা বন্ধ করে এসে বিছানায় রাগে গজ গজ করে শুয়ে পর,   সুমন ও কিছু না বলেই শুয়ে পড়ল। এখন শুয়ে শুয়ে ভাবছি কিসের এত রাগ মিতালীর মায়ের ওপর? বিয়ের আগে যতবারই সুমনের মায়ের কথা উঠেছে ততোবারই নিজেকে ভাগ্যবতী বলতো মিতালী ওয়ার্ল্ডের বেস্ট শাশুড়ি পাওয়ার জন্য।এসব ভাবতে ভাবতেই সুমনের ঘুম এসে গেল ,পরদিন সকালে সুমনের ঘুম ভাঙলো মা ও মিতালী ঝগড়ায় ।এখন আর সুমনের ঘুম মিতালির মিষ্টি ডাকে বাবা-মায়ের আদরের ডাকে ভাঙ্গেনা।সুমন আর কিছুই ভাবতে পারছে না, ও বুঝে গেছে কিছু করার নেই ওর আর ।এভাবেই ওর জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে।

          সমাজে এরকম সুমন ঘরে ঘরে আছে যারা অফিস, টাকা, আর বউ - মায়ের দ্বন্দ্বের টানাপোড়েনের মাঝে পড়ে জীবনটা ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছে।পালিয়ে যাওয়ার পথ তারা পায় না -সংসার নামক জিনিসটি নিয়ে তারা বিয়ের আগে যত স্বপ্ন দেখে সবটাই ভেঙে তছনছ হয়ে যায় বিয়ের পর।আচ্ছা বউ মায়েরা কি একটু মানিয়ে চলতে পারে না?যদি পারত তাহলে আমাদের সমাজে সুমনের মত ছেলেদের সব স্বপ্ন পূরণ হতো ,শুধু তাই নয় তারা জীবনে অনেক বেশি সফল হতো।