শেষ ঠিকানা

শেষ ঠিকানা

দিনটা ক্রমে ছোট হতে শুরু করেছে, স্নানের পর গা-হাত-পা কেমন টানতে শুরু করেছে-কথায় আছে মা দুর্গা জলে পড়ার সাথে সাথে প্রকৃতি ও নিজের রূপ পরিবর্তন করতে থাকে। কাল সন্ধ্যেবেলা তে বেশ ঠান্ডা লাগছিল, মনে হচ্ছিল হালকা একটা চাদর গায়ে দিলে বোধহয় আরাম হতো সুজাতার।সুজাতা ভাবলো আজ রোদ উঠলে চাদর, সোয়েটার গুলোতে একটু ছাদে রোদ লাগা।। উত্তরের হাওয়া বইছে খুব, হওয়াতে ছাদে জামাকাপড় গুলো বোধহয় শুকিয়ে গেছে। সুজাতা আলমারি খুলতে গেলে দেওয়ার জন্য নিজের একটা হালকা  কার্ডিগান,নির্মল এর জন্য একটা হালকা জ্যাকেট আর সাল বের করল-নির্মল সাল পড়তে খুব ভালোবাসে।কাল রাতেই তো বিছানায় শুয়ে বলছিল মর্নিংওয়াক এর সময় বেশ ঠান্ডা লাগে না।ওর মাফলার, টুপি এগুলো রোদে দিতে হ।। মাফলারটা খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ মিমির নিল সোয়েটার টা  হাতে পরলো, কতবার বলেছে সুজাতা মিমিকে যে তোর জামা কাপড় গুলো নিয়ে যা এখান থেকে।ওর একটাই কথা এগুলো সব পুরনো, এগুলোর এখন আর চলে না কিন্তু এটা তো একসময় খুব প্রিয় ছিল মিমির।ওহ, বলাই হয়নি মিমি,সুজাতা আর নির্মল এর একমাত্র মে।। ওর বিয়ে হয়েছে চার বছর হল। ওর স্বামী শুভঙ্কর বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করে -বড় ভালো ছেলে ও।মিমি ও চাকরি করতে ছয় বছর আগে কিন্তু এখন আর করে না,ও নাকি হাউস ওয়াইফ হতে চায়,সব থেকে বড় কথা ভালো মা হতে চায় তাই জন্যই চাকরিটা ছেড়ে ছিল।এসব ভাবতে ভাবতেই চোখের কোনে জল জমলে সুজাতার ।সোয়েটারগুলো নিয়ে দোতলা ছাদে উঠলো সুজাতা। এখন আর তাড়াতাড়ি ছাদে উঠতে পারেনা সুজাতা হাফ ধরে আসে- একটা সময় এই সিঁড়িগুলো দিয়ে খাবারের থালা নিয়ে মিমির পিছনে কত দৌড়ে বেড়াতো  সুজাতা,হয়তো এটাই করতে হতো ভবিষ্যতে মিমি কে, কিন্তু হলো না আর হয়তো হবেও না।ভাবতে ভাবতে সব গরম পোশাকগুলো মেললো আর শুকনো পোশাকগুলো তুলে চোখের জল মুছতে মুছতে সিঁড়ি থেকে নামল সুজাতা ,মুখোমুখি হলো নির্মল। নির্মল বলল -সুজাতা তুমি আবার..?  এইসব পুরনো কথা ভেবে সুজাতা দিনের-পর-দিন চোখের জল ফেলে ।মিমিও কেমন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে।নির্মল হাঁক দিল সুজাতা এক কাপ চা দেবে? সুজাতা খুব আস্তে উত্তর দিল হু।চা খাবে বাবা এটা শুনলেই ছোট্ট মিমি মায়ের সাথে দৌড়াতো বাবার চা করার জন্য ।এখন আর মিমি খুব একটা আসে না এই বাড়িতে, ফোন করলেও কথা বলতে চায় না। কেমন যেন এড়িয়ে চলেে বাবা-মাকে। কত  ডাক্তার কত টেস্ট তো করাল  মিমি -শুভঙ্কর কিন্তু সব ডাক্তার একই কথা উত্তর দিয়েছে মিমির পক্ষে মা হওয়া সম্ভব নয়।মিমি ছোট থেকেই বেবি কত ভালোবাসতো ।আশেপাশে বাড়ির বেবিদের এনে কত আদর করত।আর সেবার তো ট্রেনে একটা কিউট বেবি কে জোর করে আদর করতে গিয়ে একটুর জন্য মার খাওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেছে মিমি ,ভাবতে ভাবতেই আনমনে নির্মল কে চা এনে দিল সুজাতা। সুজাতা ভেবেছিল  মিমির ঘর থেকে বাড়তি জিনিসগুলো সরিয়ে ঘরটা পরিষ্কার করবে কিন্তু সুজাতার আজ আর ইচ্ছা করছে না।মিমের কথা ভাবলেই গা হাত পা ভেঙে আসে ওর, কি জানি এখন কি করছে মেয়েটা? শুভঙ্কর বলছিল ইদানিং নাকি মেয়েটা ঘর থেকে বের হতেই চায় না।ভাগ্যের কি পরিহাস যার দরকার নেই তাকে ভগবান ভরিয়ে দিচ্ছে আর যার প্রকৃত দরকার তার কোল খালি।মেয়েটা ঠাকুর-দেবতা খুব বেশি বিশ্বাস করতো না কিন্তু মায়ের রুপে পরিণতি পাবার জন্য মিমি নাকি আজকাল মহাষষ্ঠীর ব্রত নাকি করে।নির্মল কালরাতে দুঃখ করছিল মেয়েটা শুভঙ্করের জন্মদিনে কত কি করে কিন্তু এ বছর এই দিনটা ভুলেই গেল ,খুব কষ্ট পেয়েছে মা-বাবা মরা ছেলেটা। ওর জীবনের সুখের সময় শুরু হওয়ার সাথে সাথেই ভগবান কালো মেঘে ছেয়ে দিয়েছে।এসব ভাবতে ভাবতেই সুজাতা নির্মল এর কাছে এসে বলল- চলনা মেয়েটাকে আজ একটু দেখে আসি? নির্মল দ্বিমত করলোনা। মায়ের মন সারাক্ষণ উতাল পাতাল করে -ভাবলো একটু মালপোয়া করে নিয়ে যাব, এতে হয়তো মিমি একটু খুশি হবে।মালপোয়া নিয়ে বাবা-মা মেয়েকে দেখতে গেলো বিকেলে।বেল চাপতেই বেশ কিছুক্ষন পর  মিমম এসে দরজাটা খুললো -ইস কি চেহারা করেছে মেয়েটা? তাকানো যাচ্ছে না একদম। সুজাতার বুকটা কেঁপে কেঁপে উঠছে ওকে দেখে।মেয়েটাকে মনে হয় এভাবে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না, কিছু একটা করতেই হবে মনে মনে ভাবল নির্মল -এবার শুভঙ্করের সাথে এই নিয়ে কথা বলতেই হবে।ঘরে ঢুকেই মিমির পাগলামি দেখে সুজাতা আর ঠিক থাকতে পারলো না।মিমি দেয়ালের সব বেবির ফটো গুলো ছিড়ে কুটিকুটি করছে,খেলনাগুলো   আছেরে ভাঙছে- দু চোখ দিয়ে অনবরত জল গড়াচ্ছে মিমির।সুজাতা দৌড়ে গিয়ে ওকে ধরলো -কি সব পাগলামি করছিস মিমি?মিমি ও আর থাকতে না পেরে মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো-ওর চিত্কারে যেন বাড়িটা থর থর করে কাঁপছে।মিমি কাঁদতে কাঁদতে বলছে- মা কেন পারবোনা আমি মা হতে?আমি কি এতটাই পাপি যে ভগবান আমার রক্ত মাংস থেকে একটা বেবির জন্ম দিতে দিচ্ছেনা?মিমি কে শান্ত করার চেষ্টা করল সুজাতা কিন্তু সেটা বৃথাই হল।মিমি অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে আর তার মাকে ঝাঁকাচ্ছে  কি দোষ তার যে মা হত  পারবে নাা?সে যেমন তার মাকে জড়িয়ে ধরে আছে, মিমিও চায় তাকেও কোন ছোট্ট দুটো হাতে এইভাবে জড়িয়ে ধরুক ,মা বলে ডাকুক।কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে যায় মিমি-মেয়েটা বোধহয় সকাল থেকে কিছুই খাইনি। তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডাকল নির্মল,শুভঙ্কর কে ফোন করল।ডাক্তার বলল তার কিছু করার নে,, কোন নিউরোলজিস্টস  এডভাইস নেওয়ার জন্য-ঠিক এটাই ভেবেছিলাম বলছে শুভঙ্কর কে বলে এটার ব্যবস্থা করতে হবে।মিমি এখন সিলিঙের দিকে তাকিয়ে বিছানার উপর পাথরের মত শুয়ে আছে,সুজাতা নির্মল রাতটা এখানে কাটিয়ে গেল।

 কিন্তু মিমির পরিণতি এটা না হলেও পারতো।কোন একটা বাচ্চা দত্তক নিলে হয়তো মা ডাকটা শুনতে পেত মিমি।একটা অনাথ বাচ্চা ও হয়তো বাঁচার মত সুস্থ পরিবেশ পেত।সমাজ এভাবে ভাবলে হয়তো অনাথ বাচ্চা গুলো রাস্তায় পড়ে থাকতো না,আর তাতে হয়তো মিমির মত মেয়েদের ওষুধের জোরে বিছানায় পড়ে থাকতে হতো না।