অবুঝ হৃদয় পর্ব ১

অবুঝ হৃদয় পর্ব ১

প্রতিদিনের মতোই নীল সাইকেল নিয়ে বেরোলো কলেজের উদ্দেশ্যে, ভরা শীতকাল রাস্তায় দূরবীন দিয়ে খুঁজলেও জনমানবের চিহ্ন পর্যন্ত দেখা যাবেনা। ঘন কুয়াশায় ঢেকে রয়েছে চারিদিক,রাস্তার ধারের গাছগুলোতে কুয়াশায় ভিজে উঠেছে, মাঝে মাঝে বড় গাছগুলো থেকে  কুয়াশার জমে থাকা জল বিন্দু গুলো টুপ টুপ করে নীলের গায়ে ঝরে পড়ছে।এত শীতে সাইকেল চালিয়ে যেতে খুব কষ্ট হয়, এমনকি সকালে গরম লেপের উষ্ণতা থেকে বেরিয়ে আসতে ইচ্ছে করে না তবু অগত্যা কিছু করার নেই এই পথটা ও নিজেই বেছে নিয়েছে।বাবা দাদা  অনেক বলেছিল নিজেদের মাঠে ব্যবসাটা একটু একটু করে বুঝে নিতে,কিন্তু নীল আর তার মায়ের একই স্বপ্ন নীলকে বড় হতে হবে সাফল্যের চূড়ায় উঠতে হবে মানে বাস্তবে বড় বড় বিল্ডিং এর চূড়ায় অফিস তৈরি করতে হবে।উচ্চমাধ্যমিকের স্টার পেয়ে ভূগোলে অনার্স নিয়ে তাই কলেজে ভর্তি হয়েই গেল, নীল আগে ভাবতে পারেনি জিওগ্রাফি অনার্সে এত খরচ তাহলে হয়তো অন্য কিছু ভাবত।গ্রামের পরিবারগুলোর জমি জায়গা অনেক কিছু থাকলেও আর্থিক সঙ্গতি থাকেনা ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার জন্য।যদিওবা নীলের মা প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে আনার জন্য।

নীল প্রায় 40 মিনিট সাইকেল চালিয়ে কলেজের গেটে আইডেন্টিটি কার্ড দেখিয়ে সাইকেলটা গ্যারেজ করে ক্লাস রুমে এসে দেখল তখন ও ঘড়িতে পৌনে আটটা বাজে মানে ক্লাস শুরু হতে এখনো প্রায় পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট বাকি।ক্লাসের চারিদিকটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল- বেশিরভাগ ছেলেরা হাতে মোবাইল নিয়ে ডিজিটাল গেমে ব্যস্ত আর কয়েকটা মেয়ে তো হাসিতে গড়িয়ে পড়ছে।নীলের চোখ রোজকার মতো রীমার দিকে গিয়ে আটকে গেল- আজ লাল কুর্তিতে রিমাকে কি ভালো দেখাচ্ছে, মেয়েটা পড়াশোনাতেও বেশ সিরিয়াস, কারো সাথে খুব বেশি কথা বলে না যদিও নীলের তাতে কিছু এসে যায় না।এসব ছাইপাশ ভাবতে ভাবতেই স্যার ক্লাস রুমে এসে ঢুকলেন।

ক্লাসরুম পুরো চুপ, মনে হয় একটা সুচ পরার শব্দ তীক্ষ্ণ মনে হবে।নিল প্রতিদিন এম.বি স্যারের লেকচার শুনে আর ভাবে নীল কবে ক্লাস ভর্তি ছেলে মেয়েদের সামনে এইভাবে লেকচার দেবে?কি ব্যক্তিত্ব এই স্যারের -প্রতিটা শব্দ উচ্চারণ যেন স্পষ্ট,অনেকেই ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলতে পারে কিন্তু স্যারের প্রতিটা ইংরেজি উচ্চারণ যেন আলাদা আলাদা করে বোঝা যায়।উনার লেকচার শুনতে শুনতে যে কখন 40 মিনিট টা শেষ হয়ে যায় কেউ বুঝতে পারে না ।টিফিনের পর আরেকটা ক্লাস হবে তাই নীল আজ আর টিফিন আনেনি।নীল একমাত্র বাড়ি থেকে টিফিন নিয়ে আসে, নীলের দিদি সোমা হাজার কষ্ট হলেও নীলকে একেকদিন একেকটা টিফিন তৈরি করে দেয়।সোমা বেশ আধুনিক একটা মেয়ে, হয়তো গ্রামে থাকে বলেই নিজেকে মেলে ধরতে পারেনি।কোন বড় শহর বা হয়ত মফস্বলে থাকলেও সোমা আজ একটা চাকরি জুটিয়ে ফেলত।দাদা মানসের একটাই কথা মেয়ে হয়েছিস কলেজ পাস করেছিস এবার বিয়ের জন্য তৈরি হতে হবে,মেয়েদের চাকরি করে কি হবে ,কপালে যদি তোর চাকরি থাকে বিয়ের পর তোর চাকরি হবে।সোমা হাল ছাড়িনি বাড়িতে পড়াশোনা টা চালিয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে।যদিওবা বিয়ের তোর জোর বাড়ী থেকে খুবই চলছে।সোমার আপত্তি থাকা সত্ত্বেও প্রায় প্রতি সপ্তাহেই তাকে কোনো না কোনো পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে,যদিও আপত্তিটা তার অন্য জায়গায়।ও এখনো ভুলতে পারিনি কলেজের ফেলে আসা পুরনো ইতিহাস কে ...পুরনো প্রেমকে।তাইতো নীলকে মাঝেমাঝেই সতর্ক করে দেয় সোমা। নীলও সুতীর্থ দা কে জানত।ছেলেটা খুব ভালো ছেলে ছিল,আজ হয়তো সুতীর্থদা চাকরি পেয়ে স্টাবলিশ হয়ে গেছে।সোমার থেকে বছর দুয়েকের সিনিয়র ছিল সুতীর্থ।ছেলেটা সোমাকে খুব ভালোবাসতো আর সোমাও তাই।বছর তিনেক সম্পর্ক চলেছিল ওদের-কি যে হলো ওদের নীল আজও সেটা ভালো করে বুঝতে পারে না,দিদিকে অনেক জিজ্ঞাসা করায় দিদি শুধু একটাই কথা বলেছিল কাস্ট প্রবলেম।নীল ভাবে নীল তো এখন অনেক বড় হয়েছে দিদিকে এভাবে মনের বিরুদ্ধে বিয়ে করতে দেবে না নিল।অনেকদিন ধরেই নিল ভাবছে মনে মনে যে এবার সুতীর্থদার সাথে একটু কথা বলে বুঝতে হবে যে আজও কি দিদিকে ততটাই চায় সুতীর্থ দা?পর পর কয়েক দিন রাতে আবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখা যাচ্ছে দিদিকে,এবার আর চুপচাপ বসে থাকলে চলবেনা কিছু না কিছু ব্যবস্থা করতেই হবে নীলকে।নীল সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল পরের রবিবার সকালে যেভাবেই হোক নীল সুতীর্থ সাথে দেখা করে কিছু একটা ফাইনাল করে দিদিকে সারপ্রাইজ দেবে।কিন্তু সুতীর্থ দা কি আজও চায় দিদিকে...?

                চলবে.....