সাফল্যের আড়ালে

সাফল্যের আড়ালে

প্রত্যেকেরই জীবনে কিছু না কিছু যুদ্ধ থাকে তাই না? সবার জীবনে কিছু-না-কিছু সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হয় ।জীবনে টিকে থাকার সংগ্রাম সবার একই রকম হয় না ।কখনো নির্যাতনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, কখনো আর্থিক সাবলম্বীতার জন্য সংগ্রাম, কখনো বা বাস্তব পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য যুদ্ধ।

আজকের গল্পের নায়িকা সীমা.....আর সীমার সেই মেয়ে যাকে বাস্তব পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য ,আর্থিক সাবলম্বীতার জন্য নিজের সরলতার বিসর্জন দিতে হয়েছিল। শুরু করি সেই ছোট্ট সীমার গল্প যার জীবনটা ঠিকঠাক শুরু হলেও ভাগ্য দেবতার সেটা বেশিদিন সহ্য হয়নি। বছর পাচেক বয়সের সীমা স্কুল যাত্রা শুরু হলো..... ঠিকই চলছিল সবকিছু... ও যখন ক্লাস টুয়ে পড়ল ওর কাকা হঠাৎ করে ওকে খুব আদর করা শুরু কর।। পড়ানোর নামে সারাক্ষণ কোলে বসিয়ে জড়িয়ে রাখত, এখানে-ওখানে ইভেন প্রাইভেট পার্ট এ ও সুড়সুড়ি দিত আর সীমা খিলখিল করে হাসত কিন্তু আজ সীমা জানে ওটা আদর ছিল না ওটা ছিল সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট।

 

এর পর সীমার জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে - ক্লাস সিক্সের সীমার বাবা ফ্যাক্টরিতে একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেল। ফ্যাক্টরি থেকে এককালীন বেশ কিছু টাকা পেল বটে কিন্তু সীমার লাইফস্টাইল দিনের পর দিন পরতে থাকলো, চোখের সামনে কাকা আর মায়ের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে দেখতে দেখতে আরও 2-3 বছর কেটে গেল।এভাবেই ধীরে ধীরে মায়ের প্রতি সম্মানবোধ ,ভালোবাসা সবটাই কমতে থাকে সীমার। সমাজে একটা কথা প্রচলিত আছে যে মা মরলে বাপ তালই হয় কিন্তু বাপ মরলে যে মা কুমাতা হয় এটা জানা ছিল না।তারপর সীমার জীবনে অন্ধকার নেমে এল ক্লাস টেন এ.....হঠাৎ একদিন খবর এলো দাদু খুব অসুস্থ মা হন্তদন্ত হয়ে সন্ধ্যেবেলা তে বেরিয়ে পড়ল রাতে ফিরতে পারলো না আর সেই  রাতই হল সীমার জীবনের কাল রাত। সীমা রান্না-বান্না বা ঘরকন্নার কাজ মোটামুটি সবই পারত তাই রাতের রান্নাটা করে তার অবিবাহিত কাকাকে খেতে দিতে খুব বেশি অসুবিধা হয়নি।সীমার সামনে পরীক্ষা তাই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে হবে না, একটু পড়তে হবে - যেমন ভাবা তেমন কাজ। সীমার নিজস্ব কোন ঘর ছিল না মানে দরকারও ছিল না, মায়ের সাথে একই ঘরে থাকতো সীমা। খাওয়ার পর পড়তে ইচ্ছা না করলেও অনেক কষ্টে বইমুখী করলো ঘুমন্ত মনটাকে।কারণ ছোটবেলা থেকেই একটা ভালো চাকরি করার স্বপ্ন দেখতো বাবা মরে যাওয়ার পর পারিপার্শ্বিকতার চাপে সেই ইচ্ছাটা প্রয়োজনে গিয়ে ঠেকেছে।

পড়তে পড়তে হঠাৎ চমকে উঠল সীমা পিছন থেকে অদ্ভুত একটা স্পর্শে। পিছনে ঘুরে দেখে তার কাকার লালসাপূর্ন নির্লজ্জ নজর সীমার শরীরের দিকে। অনেক চেষ্টা করেও সেদিন সীমা নিজেকে কাকার শারীরিক অত্যাচার থেকে মুক্ত করতে পারেনি।পরদিন মা বাড়ি ফেরার পর কাঁদতে কাঁদতে মাকে জানালেও মা কোনো প্রতিবাদ না করে উল্টে সীমার মুখ বন্ধ করিয়ে দিয়েছিল।খুব কষ্ট হয়েছিল সেদিন ,মায়ের প্রতি আর বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা ভালোবাসা রইলো না সীমার।যাইহোক করে মাধ্যমিক টা শেষ হলো।অনেক স্বপ্ন দেখা শুরু করল মেয়েটা...সব স্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে কাকা সীমার জন্য কাকার এক বন্ধুকে পাঠালো বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে।মায়ের কাছে অনেক কাকুতি মিনতি করেও কোন লাভ হল না সীমার।আচ্ছা বলুনতো মায়েরও কি এত পরিবর্তন হতে পারে?কোন মা কি তার সন্তানের এত বড় ক্ষতি করতে পারে,?মায়ের কি নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সন্তানের এত বড় ক্ষতি করতে একবারও বুক কাঁপলো না?সত্যি কি সমাজ এত নিষ্ঠুর হয়ে গেছে?........এইসব কিছুর কোন উত্তর না পেয়ে সীমা প্ল্যান করল বাড়ি থেকে পালানোর। বাড়ি থেকে পালিয়ে কোন ভালো কিছু হলো না সীমার,পড়াশোনা তো দূরের কথা একটা থাকার জায়গা পর্যন্ত পেলনা সীমা।শেষমেষ ঠাই হলো যৌনপল্লীতে আর কিছু করার নেই দেহ ব্যবসাই হলো সিমার পেশা।বেশ কয়েক মাসে এভাবেই কাটল সীমার। প্রতিরাতেই নতুন নতুন বাবুদের সন্তুষ্ট করার প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। ভগবান বোধহয় মানুষের প্রতি এতটা রুষ্ট হয় না তাই জন্যই হয়তো সীমার আলাপ হয়েছিল নতুন এক বছর চল্লিশেক এর বাবুর সাথে যে যৌন পিপাসু হলেও মানবিকতাবোধ খোয়াইনি বা বিবেক পুরোটা বিসর্জন দেয় নি।বেশ কিছুদিন পর সীমার সাথে তার একটা ছোট্ট শর্ত হলো উনি সীমাকে পড়াশোনা করার সুযোগ দেবে আর সীমা দেবে ওনাকে যৌনতৃপ্তি।প্রায় বাবার বয়সী একটা লোকের সাথে নিজেকে জরানো ছাড়া ভবিষ্যৎ তৈরি করার মতো সুযোগ সীমা হয়তো আর পেত না। সীমার মত মেয়েদের পাশে নিঃস্বার্থভাবে কেই বা দাঁড়াবে? এভাবেই শর্তসাপেক্ষে নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে সীমার মত মেয়েদের।হায়রে সমাজ!

তাই হয়তো সব বাধা প্রতিকূলতাকে জয় করে প্রতি রাতে শরীরের বিনিময়ে দিনে দিনে নিজের ডিগ্রি বাড়িয়ে গেছে।ধীরে ধীরে অন্ধকার থেকে আলোতে টেনে নিয়েছে নিজেকে।আজ ভাবতেও ভালো লাগে সীমা একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করছে।হাজার সে প্রতি রাতে বাবুদের আনন্দ দিতে না গেলেও টানা ছয় বছরে আনন্দ দেওয়ার বাবুটিকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলতে পারেনি সীমা,প্রতিমুহূর্তে কৃতজ্ঞতা জানায় তাকে আর ধিক্কার জানায় তার মায়ের মত মায়েদের।

আচ্ছা বলুন তো আমাদের সমাজকে এতটাই নির্মম?মা শব্দের অর্থটা সীমার মত মায়ের ক্ষেত্রে পুরো পাল্টে দিল।সমাজে এমন কত মানুষ আছে যারা সুযোগ পেয়েও সুযোগটা কাজে না লাগিয়ে সুযোগগুলো নষ্ট করে দিই আর ভাবুন সিমার মত মেয়েদের?কোথা থেকে পায় এরা এত মানসিক জোর?সত্যি প্রশংসার যোগ্য এ মানসিক জোরের।এত বড় সাফল্যের পরেও পিছনে সীমাকে আজও পতিতা নামেই ডাকা হয়।সাফল্যের আড়ালে কী কী ঘটল সমাজ সেটা একবারও ভেবে দেখলনা।এটাই বাস্তব যে মানুষ প্রশংসা কে গুরুত্ব না নিয়ে নিন্দনীয় কাজকে গুরুত্ব বেশি দেয়।এই বিংশ শতাব্দীতে এসে যুগের পরিবর্তন হলেও মানুষের মনের পরিবর্তন কিন্তু একটুও হয়নি........তাই সমাজের কাছে একটাই প্রশ্ন আর কতদিন এরকম নোংরা মনের অধিকারী হব আমরা???