স্বপ্ননীড়

স্বপ্ননীড়

দীর্ঘ বছর সাতেক অপেক্ষার পর রিয়া- সায়নের সম্পর্ক পরিণতি পেলো গত 27 ডিসেম্বর।

  পুতুল আর খেলনা বাটি দিয়ে সংসার- সংসার খেলাটা এখন সত্যিই সংসারে পরিণত হয়েছে রিয়ার।ওর মাঝে মাঝে এখনোও বিশ্বাস হয় না যে তাহলে কি সত্যিই সবকিছুর শুভ অবসান হলো? কত টেনশন করেছে ওরা... কত রাত ওদের ভালোবাসার পরিণতি কি হবে সেটা ভেবে ভোর করে দিয়েছে...কতদিন ওরা একসাথে চোখের জল ফেলেছে ...কত স্বপ্ন দেখেছে, আবার স্বপ্ন ভাঙ্গার ভয়ও পেয়েছে। যাইহোক আজ তারা দুমাসের সুখী দম্পতি।

  ছোট থেকেই মায়ের রান্নাঘরের পাশে ওর একটা ছোট্ট রান্না ঘর ছিল, সেখানে বড় বড় বাসণ না থাকলেও ছোট্ট মেটালের, মাটির, প্লাস্টিকের অনেক বাসণ ছিল - আর এইগুলোই ছিল রিয়ার অনেক বড় সংসার। পড়াশোনার পর রান্নাবান্না আর পুতুল খেলা ছাড়া আর কোন কাজ ছিল না রিয়ার।

  এখন সকাল সাড়ে আটটা রিয়া ওর বাস্তবের কিচেনে গুনগুন করে নজরুলগীতি গাইতে গাইতে সায়নের অফিসের টিফিন গোছাচ্ছে।সায়ন রিয়া রিয়া করে অনেকক্ষণ ধরে হাক দিয়ে চলেছে..রিয়া  আসছি আসছি করে প্রায় আরো 5-7 মিনিট কাটিয়ে দিল। এরপর  সায়নের টিফিন ক্যারিয়ারটা সায়নের হাতে দিতেই....

সায়ন বলল কি যে করো সারাদিন রান্নাঘরে কে জানে? তোমার কি গরম লাগে না?

রিয়া কিছুটা রোমান্টিক হয়ে বলল না মশাই আমি তো সারাদিন আমার পতিদেবতার জন্যই রান্না করি। রান্না টাই যে আমার একমাত্র নেশা।

সায়ন ফের বলল তোমার এই রান্নার জন্য প্রতিদিন আমার অফিস লেট হয় ।সাত মাসের চাকরিতে দুই মাসের বিবাহিত জীবনে প্রায় প্রতিটা দিনের লেটের জন্যে কলিগরা একটু-আধটু  টোন করে যদিও সেটা মন্দ লাগে না সায়নের। 

রিয়া প্রতিদিন পাখি পড়ানোর মতো সায়নকে মুখস্ত করিয়ে দিল  যতই দেরী হোক না কেন সাবধানে যাবে, আস্তে আস্তে বাইক চালাবে বলে বিদায় জানালো ওকে। সায়ন একটা বেসরকারি অফিসে চাকরি করে ,বাড়ি থেকে খুব বেশি দূর নয় কুড়ি 22 কিলোমিটার মত হবে ।

  এই সকাল 9 টা থেকে রাত 8 টা পর্যন্ত রিয়াকে একাই থাকতে হয়।টিভি দেখে, গান শুনে কতক্ষণই বা ভাল লাগে ।যদিও এখন ওর সময় সংসার গোছানোর আর নতুন নতুন স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করা।আর সেসবের প্ল্যান করতে করতে দিনের মধ্যে প্রায় তিন চারবার ঘুমিয়ে যায় যদিও ওটাকে ঘুম বলা যায়না তন্দ্রা বলাটাই ঠিক।

  ঠিক রাত পৌনে আটটা বেজে ছে রিয়া সায়নের ফোনের জন্য অপেক্ষা করে আছে। প্রতিদিনই এই সময় সায়ন রিয়াকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করে কি কি বাজার আনতে হ.... আজও ব্যতিক্রমী নয়।রিয়া উত্তর দিল সামনাসামনি যা পাও নিয়ে এসো। ঘরে কোন সবজিই নেই।

  ইদানিং প্রায় 7-8 দিন ধরে যে কি হলো সায়ন বাড়ি ফিরেও খাবার পর ল্যাপটপে অফিসের প্রজেক্ট নিয়ে বসে।রিয়া আর অপেক্ষা করতে পারে না সারাটা দিন একা কাটায়, সারাক্ষণ সায়নের অপেক্ষায় থাকে কিন্তু কিছু করারও নেই সায়নের কাজ করতে হবে। সেদিন শুনেছিল সায়নের হয়তো প্রমোশন হয়ে যাবে, এই কদিনে চাকরিতে প্রমোশন হওয়াটা খুব কঠিন তাই রিয়া ও কোন কাজেই আটকায় না সায়নকে।

  আজ রাত এগারোটা বাজে আর কতক্ষণ কাজ করবে সায়ন ...রিয়ার ঘুম চলে আসছে কিন্তু এখন ঘুমিয়ে গেলে সায়নের সাথে গল্প খুনসুটি কিছুই হবে না।কত কথা সারাদিন রিয়া ভাবে সেগুলো তো সায়নকে শেয়ার করাই হবে না। তাই ঘুম আটকাতে হাতে মোবাইল নিয়ে টেপাটেপি করতে করতে ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখলো যে তার রান্না সম্পর্কিত।যেহেতু রান্না সম্পর্কিত তাই রিয়ার আকর্ষণটা অনেক বেশি। রকেটের মত উড়ে গেল ওর চোখের ঘুম, দেখতে দেখতে সায়ন চলে এলো তারপর ওরা গল্প করতে করতে প্রতিদিনের মতো ঘুমিয়ে গেল।

  পরদিনও রিয়ার মাথায় ভিডিওটা ঘুরতে লাগলো।সব কাজই প্রায় রিয়া সায়ন কে না জানিয়ে করত না অথচ না জানিয়েই রিয়া রান্নার ওয়েবসাইটে নতুন নতুন ওর আবিষ্কারের রেসিপি আপলোড দিতে থাকলো সারাদিন ধরে।বেশ মজাই লাগছিল। বিয়ের পর এই প্রথম ওর সারাটা দিন খুব ব্যস্ততায় কাটলো।

  এভাবেই কাটলো সাত দিন।

সাত দিন পর হঠাৎ ও দেখতে পেল ওর একাউন্টে 750 টাকা ক্রেডিট হয়েছে।ফোনে মেসেজটা দেখে প্রথমে বিশ্বাস হয়নি ওর।ওতো এমনিই অ্যাকাউন্ট নাম্বারটা অ্যাড করেছিল সেটা যে সত্যি সত্যি এত টাকা যে আসবে ভেবে পাচ্ছেনা।টাইম পাস ভেবে যেটা করেছিল সেটা থেকে যে ইনকাম হতে পারে ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছে রিয়া।সাথে সাথে সায়ন কে ফোন করে সবটা বলল রিয়া।সায়ন ও বেশ আগ্রহী হয়ে ওর কলিগ দের সবটা বলল।সবাই বেশ বাহবা দিচ্ছে রিয়াকে।সায়ন তো আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেছে বউয়ের এই ক্রিয়েটিভিটি তে।আর মনে মনে ভাবছে আগেতো রান্নাঘরে থাকলেই বকাঝকা করত।

রিয়ার ও বেশ স্বপ্নই লাগছে ব্যাপারটা।সুখটা মনে হচ্ছে তিন গুণ 4 গুণ বেড়ে গেল।ও নিজেও ভাবতে পারেনি কখনো যে রান্না ওর এতদিন নেশা ছিল আজ সেটা পেশা হয়ে গেল।