ভাঙ্গা গড়ার খেলা

ভাঙ্গা গড়ার খেলা

ঘড়িতে ঠিক ছটা বেজে 6 মিনিট।

রিমার বাড়ি ফেরার সময় পেরিয়ে গেছে, আজকাল প্রায়ই রিমার দেরি হয় কিন্তু আজ চারপাশটা অন্ধকার করে এসেছে হালকা ঝড় হচ্ছে.... অসময়ে ঝড়-বৃষ্টি..... মেয়েটা মনে হয় ছাতা নিয়েও যায়নি। রথীন বাবু ছাদে পায়চারি করছে আরে দুর রাস্তার দিকে তাকিয়ে মেয়ের জন্য অপেক্ষা করছে। আজ খুব ভয় করছে মেয়ের জন্য। আতঙ্কে কাটায় লোকটা সবসময়।ভগবান নাকি মানুষের জীবনের একভাগ অন্ধকার দিলে আর একভাগ আলোতে ভরিয়ে দেয় কিন্তু রথীন বাবুর কপালটাই পোড়া। বহু পরিকল্পনায় অনেক আশা নিয়ে সুখের ঘর বাধলেও সেটা ক্ষণস্থায়ী হয়.... তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায়।

লোকটা ছোটবেলা থেকেই প্রায় অনাথের মতোই ঠাকুমার কাছে বড় হয়েছিল, নিজেকে নিংড়ে একটা চাকরি জুটিয়ে ছিল বটে। তারপর প্রেম করে বিয়ে ও করেছিল, বিয়ের ঠিক তিন বছরের মাথায় সাত মাসের রিমাকে রেখে তার স্ত্রী একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান-আর ওই তিন বছরই রথীনবুর জীবনের বেঁচে থাকার স্বপ্ন।সাত মাসের বাচ্চাকে নিয়ে তখন রথীন বাবু একদিকে অথৈ সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছেন আর অন্যদিকে জীবনের সবচেয়ে বড় সঙ্গীকে হারানোর যন্ত্রণায় কাবু হয়ে  যাচ্ছেন।এভাবেই বেশ কয়েকটা মাস কেটে যাচ্ছিল ঠিকই কিন্তু নিজের মেয়েকে কতদিনই বা লোকের বাড়িতে রেখে অফিস করা যায়...... লোকজন প্রথমদিকে ভালোবাসলেও পরে ধীরে ধীরে তারা বিরক্তি দেখাতো-আজকাল তো নিজের আত্মীয় পরিজনরাই দেখে না আর পাড়ার লোক দেখবে এটা আশা করা যায় কি করে? এরপর পাড়া-প্রতিবেশী,অফিস কলিগদের বুদ্ধিতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মা মরা মেয়ের কথা ভেবে রথীন বাবু শর্তসাপেক্ষে আরেকবার বিয়ে করলেন। প্রথম দিকে বেশ ভালই চলছিল কিন্তু বছর না ঘুরতেই দ্বিতীয় স্ত্রী শর্ত ভেঙে নিজের বাচ্চার মা হতে চাইলেন।রথীন বাবুর এই একটাই শর্ত ছিল সে দ্বিতীয় কোন বাচ্চার জন্ম দেবে না কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সব মেয়েরই হয়তো মাতৃত্ববোধ প্রবল হয়ে ওঠে,নিজের নাড়ি ছিঁড়ে সন্তানের জন্ম দিতে ইচ্ছে হয় তাই রথীন বাবু স্ত্রীর কোন দোষ না দিয়েই আপসে আলাদা হয়ে গেলেন দুজনে। আবার শুরু হল মেয়েকে নিয়ে নিঃসঙ্গ জীবন। মেয়ের বয়স তখন বছর 3 ছুঁই ছুঁই। একটা বোর্ডিংয়ে মেয়েকে ভর্তি করে দিয়ে আসা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না তার কাছে। মেয়েকে এভাবেই বড় করলেন। মাধ্যমিক পাস করার পর বাড়ি নিয়ে এলেন রিমাকে।রিমা তখন বেশ বড় , বোর্ডিং  এ বড় হয়েছে নিজের কাজকর্ম সব নিজেই করতে পারতো তার ফলে বাবা মেয়ের জীবন বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই কাটছিল। ভগবান তো সেই সুখ কিছুতেই বজায় রাখলেন না। যখন কলেজ পাস করল রিমা হঠাৎ সুইসাইড এটেম করল। রথীন বাবুর মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল এটা ভেবে যে তার জীবনের শেষ সম্বল তাও তাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইছে।অনেক জিজ্ঞাসাবাদ করে রথীন বাবু জানতে পারলেন মেয়ে প্রেগনেন্ট আর তার প্রেমিক তাকে ধোঁকা দিয়েছে বিয়ে করতে চায় না। মা মরা মেয়ে তো আবার বাবাকেও পাশে পাইনি তাই ছোটবেলা থেকে বেশ অভিমানী।মেয়েরা বড় হলে নাকি মায়ের কাছে সবকিছু শেয়ার করতে পারে কিন্তু রিমা তো একা বাবার সাথে তাই দরকার ছাড়া কখনো কোনো কথাই বলত না তাই হয়তো এত বড় ভুলটা করে ফেলেছিল। এরপর রথীন বাবু মেয়েকে কোনরকম বুঝিয়ে সুস্থ করে তুললেন। অনেক চেষ্টা করেছিলেন মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার কিন্তু মেয়ে খুব জেদী আর অভিমানী তাই সে কিছুতেই বিয়ে করতে চাইছিল না। এছাড়াও আমাদের সমাজে কোন পোয়াতি মেয়েকে কোন শর্ত ছাড়া কোনো ভালো ছেলে বিয়ে করবে এতটাও বড় মানসিকতার পরিচয় সহজে পাওয়া যায় না। আর রিমার জেদ সে তার সন্তানকে জন্ম দেবে ই। যদিও এটাকে জেদ বললে অন্যায় হবে প্রত্যেকটা মা চায় তার সন্তানকে সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে জন্ম দিতে তাই রীমাও সেটাই চেয়েছিল।

সমাজের ছোট বড় অশ্লীল কথা, অপমান সহ্য করে কুমারী রিমা পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছিল, আর আজ সেই পুত্রের বয়স বছর পাঁচেক হবে। সমাজ তাদেরকে সত্যিই এক ঘরে করে দিয়েছিল, পিছনে নয় তাদের সামনেই সবাই তাদেরকে হাসির পাত্র বানাত। আজও রিমার ছেলেকে সমাজ ছোট-বড় অনেক অপমানই করে। এমনকি স্কুলের মত প্রতিষ্ঠানেও ছেলেকে নিয়ে দিদিমণিদের উৎকণ্ঠার শেষ থাকেনা। আজ রিমা একটা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরী করে। সমাজকে এড়িয়ে রথীন বাবু তার মেয়ে আর নাতিকে নিয়ে বেশ দিব্যি আছে এখন।

কিন্তু জানিনা আজ কেন রথীন বাবুর মনটা এতটা উতলা হয়ে আছে, পরিবেশ অন্ধকার হওয়ার সাথে সাথে মনটাও যেন অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। অযথাই কি মেয়ের জন্য চিন্তা করছে নাকি আগাম বিপদের সংকেত পাচ্ছে..... আসলে জীবনে এত স্বপ্ন ভেঙেছে যে নতুন কোন কিছু করতেও ভয় পায়।