ভুলের মাশুল

ভুলের মাশুল

"বাতাসে বহিছে প্রেম.. নয়নে লাগিল নেশা.." নয়নে যে কিসের নেশা লেগেছে রাহুলের তা কে জানে? দুদিন পরপর চোখ লাল করে আঞ্জনি বাঁধিয়ে বসছে। সুতপা (মা) কিছুদিন ধরে ভাবছে একবার ভালো কোন আই স্পেশালিস্ট কে দেখিয়ে নেবে কিন্তু রঞ্জন (বাবা) কোনো গুরুত্বই দেয় না।এই হয়েছে ছেলেদের স্বভাব একটুতে গুরুত্ব দেয় না , পরে বাড়াবাড়ি হলে হাজার হাজার টাকা খরচ করবে শুধু তাই নয় সাথে টেনশন ও করবে।সংসারের কর্তার উপর কথা বলা বা তাকে এড়িয়ে নিজে থেকে কোন কাজ সুতপা করবে এতটা স্বাধীনতা নেই সুতপার। মায়া দেবী (শাশুড়ি)সুতপা কে মায়ের মত ভালবাসলেও স্বাভাবিকভাবেই ছেলের প্রতি বেশি দুর্বল, ছেলের দোষ ত্রুটি তার চোখেই পড়েনা। যদিও রঞ্জন সেরকম ছেলে নয় তবুও মানুষ তো তাই ছোটখাটো ত্রুটি সবারই থাকে।

সেদিনই যেমন-অফিস বেরোনোর আগে বলে গিয়েছিল সুতপা আর ছেলেকে স্টেশন মোড়ে দুপুর তিনটে দাঁড়াতে।ভরা দুপুরে কাঠফাটা রোদে মা-ছেলে সিনেমা দেখবে বলে রঞ্জন এর জন্য স্টেশন রোডে পাক্কা চল্লিশ মিনিট অপেক্ষা করার পর রঞ্জন ফোনে জানালো সে ভুলেই গেছে-সেদিন সুতপা খুব রেগে গিয়েছিল।ছেলের স্কুলটাও মিস হলো আবার কতক্ষণ রোদে দাঁড়িয়ে ও সিনেমা দেখা হলো না। রঞ্জনের ভোলা রোগটা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। সুতপা এই নিয়ে বেশ চেঁচামেচি করে এখন , তাতে  আবার মায়াদেবীর গায়েও লাগে। মা তো তাই ছেলের বদনাম শুনতে পারেন না,ছেলেকে নিয়ে কোনো কথা তিনি সহ্য করতে পারেন না। মাঝে মাঝে এই নিয়ে বৌমা শাশুড়ির মধ্যে বেশ কথা কাটাকাটি লেগে যায়।আর সেই দিন তো এতটাই রাগ করলেন মায়াদেবীর যে তিনজন মিলে চেষ্টা করেও রাতে তাকে ভাত খাওয়ানো গেলো না। সুতপা মাঝে-মাঝেই বলে রঞ্জন কে, দেখবে এই ভোলার রোগের জন্য তোমাকে একদিন বড়োসড়ো রকমের মাশুল দিতে হবে। রঞ্জন সবকিছুতেই ডোন্ট কেয়ার ভাব, হেসেই উড়িয়ে দেয়। রঞ্জন খুব সাংসারিক না হলেও সংসার বিমুখ নয়, নিজের সংসার কে ভালোবাসে। বাইরের পরিবেশের থেকে সংসারকে বা সংসারের মানুষগুলোকে অনেক বেশি প্রায়োরিটি দেয়। তাই সুতপা মাঝে মাঝে চিৎকার-চেঁচামেচি করলেও সুতপা নিজেই জানে সে মন থেকে অনেক সুখী, খুশি। দেখতে দেখতে রাহুলও ক্লাস ফোর  পাশ করে ফেলেছে হাইস্কুলে ভর্তি হবার পালা এবার।

আজ 21 শে ডিসেম্বর....

সুতপা সকালে অফিস যাওয়ার সময় রঞ্জন কে বলে দিচ্ছে আজ রাহুলের স্কুলে ভর্তির ডেট, দুপুর দুটোর মধ্যে রঞ্জন যেন স্কুলে চলে আসে।সকাল 11 টায় সুতপা আর রাহুল গিয়ে স্কুলে ভর্তির লাইনে দাঁড়াবে, তারপর গার্ডিয়ান হয়ে সাইনটা রঞ্জন এসে করবে। যেমন বলা তেমন কাজ 11 টা  দশে পৌঁছে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে রইল।এত তাড়াতাড়ি এল তাও সামনে প্রায় 100 জনের বেশি গার্ডিয়ান দাঁড়িয়ে রয়েছে। লাইন খুব ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তাই ফোনটা ব্যাগ থেকে বের করে সুতপা রঞ্জন কে ফোন করে বলবে ভাবল এত তাড়াহুড়ো করে আসার দরকার নেই ধীরেসুস্থে এসো ,কিন্তুরঞ্জন ফোনটা রিসিভ করল না, মাঝে মাঝে এরকম রঞ্জন ব্যস্ত থাকলে ফোন রিসিভ করেনা তাই সুতপা আর দ্বিতীয় বার কল করলো না, ভাবল ফ্রি হয়ে নিজেই রঞ্জন ফোন ব্যাক করবে। লাইন এবার বেশ এগোচ্ছে,সুতপা আবার ফোন বের করে রঞ্জন কে ফোন করল কিন্তু কোন লাভ হল না রঞ্জন এবারেও ফোনটা ধরল না। এরপর বেশ কয়েকবার সুতপা ফোন করছে রঞ্জনকে কিন্তু রঞ্জন ফোনটা ধরছে না। সামনে আর মাত্র তিনজনের লাইন, এবার বেশ টেনশন হচ্ছে সুতপার.. দুপুর সাড়ে তিনটে বাজে তাও রঞ্জন এর পাত্তা নেই। খুব রাগ হচ্ছে ....কিছু করার নেই পিছনের লোককে সামনে ভর্তি হতে সুযোগ দিচ্ছে সুতপা... কি করবে সুতপা কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। স্কুলের প্রিন্সিপাল কে গিয়ে সুতপা রিকোয়েস্ট করলো যে মা হয়ে গার্ডিয়ান হিসেবে সাইন করতে পারে কিনা... কিন্তু প্রিন্সিপাল নারাজ। টেনসনে সুতপার গা হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে সাথে রাগে মাথাও গরম হয়ে গেছে। কি করবে ও এখন- তাহলে কি রাহুল স্কুলে ভর্তি হতে পারবে না? রঞ্জন কি সত্যিই ভুলে গেছে নাকি কোন বিপদ ঘটলো এটা ভেবেও বেশ টেনশন হচ্ছে সুতপার। সাড়ে চারটে পর্যন্ত অপেক্ষা করে অগত্যা বাড়ি ফিরে গেল সুতপা। বাড়ি ফিরতেই মায়া দেবী সুতপা কে বলল দেখতো বউ মা ছেলের ফোনে কে এতবার ফোন করলো? বাড়িতে ফোনটা ফেলে রেখে গেছে এটা ভেবেই সুতপার সারা শরীর রাগে ফেটে পড়ছে।বাড়িতে না হয় ফোনটা ফেলেই গেছে কিন্তু একটা মানুষ কি করে এতটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ভুলে যায় এটা কিছুতেই ভেবে পায়না সুতপা। আজ বাড়ি ফিরলে একটা হেস্তনেস্ত হবে। এবছর ছেলের আর স্কুলে ভর্তি হওয়া হলো না এটা কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছে না সুতপা। সব মা-ই তার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে থাকে সেখানে এত বড় একটা ঘটনা.....সত্যিই এতটা মাশুল দিতে হবে ভাবতে পারিনি কখনো........