করুন বাস্তব

করুন বাস্তব

কি জানতে চান বলুন?

হ্যাঁ আমি হিজড়া হয়ে জন্মেছিলাম।

এতে আমার বা আমার বাবা-মায়ের দোষটা কোথায় বলুন তো? আমার জন্মের পর থেকেই মা বাবাকে অনেক অপমান সহ্য করতে হয়েছে।গ্রামে জন্মেছি তো তাই স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সমাজটা একটু বেশিই কুসংস্কারাচ্ছন্ন-প্রথমদিকে সমস্ত শুভ অনুষ্ঠান থেকে মা বঞ্চিত হয়েছিল-মা নাকি অশুভ। আচ্ছা আপনারা শহরের মানুষেরা বলুন তো কখনো ও কোনো মা অশুভ হয়? যে মা দশ মাস দশ দিন কোন বাচ্চাকে গর্ভে রেখে জন্ম দেওয়ার পর কি  সে অন্যের বাচ্চার জন্য অশুভ হতে পারে? যাইহোক ছাড়ুন। এরপর ক্রমশ আমাদের একঘরে করে দেওয়া হয়। আমিও ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করলাম, বাড়ির বাইরে খেলতে যাওয়ার বায়না করাও শুরু করলাম। মায়ের আপত্তি সত্ত্বেও লুকিয়ে বেরোতাম, সব বাচ্চাদের সাথে গিয়ে খেলতাম।কিন্তু প্রতিদিনই দেখতাম বন্ধুদের মায়েরা তাদের জোর করে আমার থেকে আলাদা করে দিতে শুরু করছে-আমি ছোট্ট কিছুই বুঝতাম না শুধু বেশ কিছুটা অবাক হতাম আর কষ্ট পেতাম।জানেন মাকেও বহুবার জিজ্ঞেস করেছি কেন মা এমন হয় আমার সাথে? কোন উত্তর দিতে পারত না মা, শুধু এড়িয়ে যেত-এখন বুঝি মায়ের কতটা কষ্ট হতো।

বাবা একটা চটের কারখানার সুপারভাইজার, কাজের খুব প্রেসার আর মাথায় খুব চাপ তার ওপর পাড়া-প্রতিবেশীর খুচরো ব্যঙ্গ এসব নিতে পারত না জানেন তাই আমার বাবা-মায়ের মধ্যে অশান্তি হতো। ভগবানের অশেষ কৃপা আমার ওপর...যেহেতু আমি বাবা মায়ের প্রথম সন্তান তাই খুব ভালোবাসারও তাই হয়তো কখনো অবহেলা করেনি আমাকে।

এরপর আমার বয়স যখন ছয় বছর তখন আমার একটা মিষ্টি বোন হল। খুব আদর করতাম ওকে, ওর সাথে খেলতাম সারা দিন। মা ও আমার কাছে ওকে রেখে নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারত। ততদিনে আমি গ্রামের একটা স্কুলে পড়াশোনা করা শুরু করে দিয়েছিলাম। যথারীতি সেখানেও অবহেলা, আমাকে আলাদা করে রাখা-জানেন খুব কষ্ট হতো .... ছোট ছিলাম তো ভয় লাগতো কিছু বলতেও পারতাম না। এমনকি ভালো স্টুডেন্ট হওয়া সত্বেও দিদিমণিরা ও আমার সাথে সেভাবে কথা বলত না, নিয়ে যেন কেমন আতঙ্কে থাকতো তারা-তখন সেটা বুঝতাম না আজ বড় হয়েছি বেশ বুঝতে পারি। প্রাইভেট কোন টিউটর আমাকে পড়াতে চাইতো না। আচ্ছা শিক্ষা পাওয়ার অধিকার ও কি নেই আমার?যাই হোক তারপর একটু বড় হতেই দেখতে পেলাম বোন ও ঘরের বাইরে কারো সাথে মিশতে পারছে না, কেউ ওর সাথে মিশতে চাইছে না-এখন বুঝি সেটা কেবলমাত্র আমার জন্যই-এখন খুব দোষী মনে হয় নিজেকে যে আমার জন্যই বোনকে ওর শৈশবটা বিসর্জন দিতে হয়েছিল। ‌ আমি আর বোন দিব্যি খেলা করতাম।

তারপর এল হাই স্কুলে ভর্তির পালা।আমি ছেলে কিনা মেয়ে ঠিক জানিনা কিন্তু যেহেতু ছেলেদের মতো দেখতে তাই আমাকে ছেলেদের স্কুলে ভর্তি হতে হলো। আমার দেহটা পুরুষের হলেও মনটা কিন্তু মেয়ের এটা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করলাম .... তাই বোনের সাথে মিশতে বেশ ভালই লাগত, ওর সাথে সংসার-সংসার খেলা, পুতুল খেলা ছেড়ে কখনো মাঠে ফুটবল বা হাতে ক্রিকেট ব্যাট তুলে নিতে ইচ্ছা করেনি। মনটা মেয়ের তো তাই স্বাভাবিকভাবেই বোন যখন সাজতো আমিও ওর মতো করে সেজে ফেলতাম। মা খুব বকা দিত এমনকি মারতো ও। এখনো হাতের ওরাত একটা দেখলে সে দিনের কথা মনে পড়ে-জানেন সেদিন খুব সেজেগুজে বোনের সাথে সরস্বতী পুজোর ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিলাম, বাড়ি ফেরার পর মা উনুনের পোড়া কাঠ দিয়ে মেরেছিল। খুব  কেঁদেছিল জানেন সেদিন মা। এরকম মাকে মাঝে মাঝে লুকিয়ে কাঁদতে দেখতাম,, বুঝতাম মা আমার জন্যই কাদছে, কষ্ট পাচ্ছে কিন্তু কিছু করার ছিল না আমার।

এবার আসি হাইস্কুলের কথায়-প্রথমদিকে কোন অসুবিধা না হলেও বড় হওয়ার সাথে সাথে আমার অস্বাভাবিক গলার আওয়াজ, হাঁটাচলা, আদব কায়দা, হাতে তালি দেওয়ার প্রবণতা সবার থেকে আলাদা প্রমাণিত করেছিল। কোন বন্ধু ছিল না জানেন আমার... বন্ধু তো দূরের কথা কেউ কাছে এসে বসতো না পর্যন্ত। স্কুলের লাস্ট বেঞ্চ টা আমার জন্য বরাদ্দ ছিল।একটুও ইচ্ছে করতো না স্কুলে যেতে, শুধু বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে মুখ বুজে সব করতে হয়েছে আমাকে। আমি তখন বেশ বুঝতে পারি যে আমি আর পাঁচটা ছেলের মত নই। কিন্তু ছোট থেকেই কারো সাথে মিশতে পারতাম না তাই একটু ইন্ট্রোভার্ট টাইপের তাই এসব কারো কাছে শেয়ার করতে পারতাম, খুব কষ্ট হতো নিজের মধ্যে। গুটিয়ে রাখতাম নিজেকে। এরপর যখন ক্লাস টেন এ উঠলাম তখন নিজেকে বেশ পরিপূর্ণ লাগত, মনটা বেশ ভালো লাগতো, এই প্রথম আমার নিজেকে ঘৃণার পরিবর্তে  ভালো লাগা শুরু হলো, স্কুলে আসতে ভালো লাগতো কারণটা কি জানেন?আমার একটা বন্ধু হয়েছে যার কাছে এতদিনের জমে থাকা সব কষ্ট উগরে দিতে পারছিলাম, মন খুলে সব কথা বলতে পারছিলাম, মনের আবেগ প্রকাশ করতে পারছিলাম, হয়তো তার ওপরে অনেকটা ডিপেন্ডেন্ট হয়ে পড়েছিলাম আর সেটা সে বুঝত। আর তাই মাধ্যমিকের পর সেও সেটার সুযোগ নিয়ে আমার সাথে জোর করে যৌন সম্পর্ক করল। সব হারিয়ে আমি তখন দিশেহারা। বাবা-মা এমনকি সবচেয়ে আদরের ছোট বোনকেও এড়িয়ে চলতাম, খারাপ ব্যবহার করতাম, কাঁদতাম আর ভগবানকে দোষ দিতাম। জানেন পড়াশোনাটাও ছেড়ে দিলাম। কতটা কষ্ট পেলে মানুষ এতটা নির্মম হয় ভাবুন..... এভাবেই কাটলো আরো 3-4 মাস।

আমারবয়স তখন 17।

দিনটা 26 শে মার্চ

এখনো মনে আছে আমাকে জোর করে একটা হিজরার দল মা-বাবার কাছ থেকে আমাকে নিয়ে চলে গেল। বাবা মা বোন খুব কেঁদেছিল-সেদিন কিন্তু কোন প্রতিবেশী, সারা পাড়ার লোক আমাদের বাড়িতে এসে সাক্ষী হয়েছিল সেই নির্মম দৃশ্যের ‌তারপর এখানে এসে আমাকে অনেক প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করালেন হিজড়ারা। হিজড়া হিসেবে আমার অভিষেক হলো। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো কিন্তু আজ আর হয় না জানেন। আজ আমি মন খুলে মেয়ে হয়ে সবার সামনে সাঁজতে পারি, লুকিয়ে টিপ লিপস্টিক পড়তে হয় না। চুল বড় করে, শাড়ি পড়ে নিজেকে একটা নারী তৈরি করতে পেরেছি।হয়তো লজ্জাতেই ধীরে ধীরে বাবা-মা ও যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে আমার সাথে।আমি তাদের কখনোই দোষ দেই না কারণ নিজের চোখে দেখে বড় হয়েছি আমার জন্য তাদেরকে কতটা সহ্য করতে হয়েছে তবুও তারা একটা মুহূর্তের জন্য আমাকে কখনো অবহেলা করেনি,আমার থেকে দূরে থেকে যদি তারা এখন ভালো থাকে তাহলে থাকুক না।

আজ আমার বয়স 35 বছর। আমার ব্যাংক একাউন্টে কমবেশি 12 থেকে 14 লাখ টাকা আছে, একটা বাড়ি আছে, গাড়ি আছে। আর যেটা না বললেই নয় চারটে ছেলে মেয়ে আছে আমার-তাদের খুব ভালোবাসি জানেন, খুব যত্ন করি, ওদের নিয়েই কেটে যায় সারাটা দিন আমার-আরে অবাক হলেন তাই না? না ওদের আমি জন্ম দেয়নি, আদৌ জন্ম দেয়ার ক্ষমতা আমার নেই-তাই জন্য কি মাও হব না? হ্যাঁ ওরা অনাথ ছিল কিন্তু আজ ওদের মা আছে। মা হিসেবে আমি পরিপূর্ণ শুধু তাই নয় হিজরা হিসেবেও আমি গর্বিত অহংকার পূর্ণ।

এবার বলুন...

আমাদের মতো মানুষদের জীবন সমাজের কুসংস্কার এর জন্যই থেমে যায়, শিক্ষিত হওয়ার সুযোগও পাই না-তাই আপনাদের মত শিক্ষিত মানুষ তথা সমাজের কাছে এটাই প্রশ্ন যে আমি হিজরা তাতে দোষটা কার? আমরা কি মানুষ নই?আমার জীবন ভর অবহেলা, লজ্জা, হাসির পাত্র হওয়া এর দায়টা কে নেবে? আমার পরিবারের অপমান, অসম্মান বা একাকীত্ব এটার দায়ভার কে নেবে? আমাকে সৃষ্টি তো করেছে আপনাদের ভগবান , তাহলে দায় টা কার? আমার কথা তো ছেড়েই দিন সমস্ত খারাপ কিছু কেন ভোগ করতে হবে আমার বাবা মাকে?