শেষ থেকে শুরু

শেষ থেকে শুরু

ক্রিং ক্রিং....

বাড়ির বেল বাজতেই সৌম্য চায়ের কাপটা রেখে খুলছি বলে মেইন দরজার দিকে দৌড়ে গেল।

দরজা খুলেই প্রায় 360 ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে মাথাটা ঘুরে গেল ওর। আর যাই হোক ওকে তো এক্সপেক্ট করে নি।

আরে তুমি? কি মনে করে?

প্রিয়াঙ্কা-না মানে...

(ওহো বলে রাখি প্রিয়াঙ্কা সৌম্যর ডিভোর্সি স্ত্রী)

সৌম্য-কেন এসেছ সেটা তো বলবে? কিছু ফেলে রেখে গেছো নাকি এই বাড়িতে?

প্রিয়াঙ্কা নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে না বলল।

সৌম্য-তাহলে কি নতুন বিয়ের ইনভিটেশন কার্ড দিতে এসেছ? কি নির্লজ্জ মেয়ে রে বাবা। একমাস হয়নি মিউচুয়াল ডিভোর্সের তার মধ্যেই বিয়ে..?

প্রিয়াঙ্কা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

সৌম্য আবার চিৎকার করে বলল আরে কেন এসেছ সেটা তো বলবে। এতদিন তো বেস্ট ফ্রেন্ড বেস্ট ফ্রেন্ড করে মাথা খারাপ করে দিয়েছিলে,সব সময় তার সাথে আমার কম্পেয়ার করে আমাকে দুর্বল করে দিতে। যাই হোক সেসব ছাড়ো কেন এসেছ সেটা বল....

প্রিয়াঙ্কা ঘরের ভেতরের দিকটা দরজা থেকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল -এখান থেকেই তাড়িয়ে দেবে নাকি ঘরে বসে তোমার হাতের 1 কাপ সুগার ফ্রি কপি পেতে পারি?

এবার সৌম্য বেশ কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললো এসো ঘরে এসো...খানিকটা টোন করেই বললো নিচে আবার তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড অপেক্ষা করছে না তো... তাহলে তাকেও ডেকে নিতে পারো আমার এখন আর কোনো কিছুতেই আপত্তি নেই।

প্রিয়াঙ্কা কিছু না বলে চুপ করে সেই চেনা সোফাটার কুশান গুলোকে পুরনো অভ্যাসেই গুছিয়ে তারপর বসলো, আর সৌম্য কেও বসতে বলল।

সৌম্য কড়া গলায় উত্তর দিয়ে বলল না আগে কফিটা করে নিয়ে আসি তারপর তুমি কফি খেতে খেতে বলবে হঠাৎ কেন আবার তোমার পা পরলো এই বাড়িতে।

সৌম্য রান্না ঘরে যেতেই প্রিয়াঙ্কা ঝটপট করে বেডরুম আর ব্যালকনি টা একটু ঘুরে দেখে গেল, নিজের হাতে গুছানো সব জিনিস গুলোকে খুব চোখ বুলিয়ে নিতে ইচ্ছে করলো। ঠিক তখনই সৌম্য এক কাপ কফি হাতে ফিরে এলো।

প্রিয়াঙ্কা থতমত খেয়ে জিজ্ঞাসা করল তুমি খাবে না?

সৌম্য-না (খানিকটা হুমকির স্বরে)। এবার বল হঠাৎ কেন ...?

প্রিয়াঙ্কা-এমনি এলাম... দেখতে এলাম তুমি কেমন আছো?

সৌম্য-কি দেখলে? শোনো প্রথমে ভাবতাম তোমাকে ছাড়া বুঝি কলকাতায় আমি অচল, থাকতে পারবো না কষ্ট হবে।হ্যাঁ কষ্ট সত্যিই হয়েছিল কিন্তু এখন দিব্যি আমি ভালো আছি, গুছিয়ে নিয়েছি জানো সবটাই । সকালে ব্রেকফাস্ট করে অফিস যাচ্ছি, দুপুরে ক্যান্টিনে লাঞ্চ করছি, আর রাতে হোটেল থেকে খাবার খেয়ে লেট করে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে পড়ছি-সবই চলছে শুধু একটা জিনিসই নেই-তোমার অসহ্য চিৎকার।

প্রিয়াঙ্কা কিন্তু খুব বেশি অবাক হলো না এটাই স্বাভাবিক। বুকের বাম দিকটা কষ্টে শুধু একটু চিনচিন করে উঠলো।

সৌম্য আবার-যাইহোক বল কেন এলে?আমি কেমন আছি সেটা জানার উদ্দেশ্যে যে তুমি আসবে না সেটা আমি খুব ভাল করেই জানি, আফটার অল তোমাকে খুব ভাল করেই চিনি।

প্রিয়াঙ্কা-আসলে এই কদিন আমি তোমাকে বাড়িতে খুব বেশি মিস করেছি, দূরে থেকে বুঝেছি যে তোমাকে....

আর কথা বলতে দিল না সৌম্য থামিয়ে দিয়ে বলল-কেন তোমার  বেস্ট ফ্রেন্ড কি তোমায় টাইম দিচ্ছে না?

প্রিয়াঙ্কা-ঠিক তা নয় ‌

সৌম্য সাথে সাথেই-ঠিক তা কি?

সৌম্য আবার বলল-বল?

প্রিয়াঙ্কা- দূরে গিয়ে তোমাকে পাশে পেতে ইচ্ছে করে। খুব পরিষ্কার হয়ে যায় তখন আমার করা ভুল গুলো। মনে হয় আরেকটু সহ্য করলে হয়ত পারতাম....আবার এটাও মনে হয় একটু অকারণেই বেশি কিছু করে ফেলতাম...

সৌম্য -(এবার চিৎকার করে) নাটক নাকি? মামদোবাজি হচ্ছে? ওই বেস্ট ফ্রেন্ড কি বিয়ে করবে না বলে দিয়েছে? এভয়েড করছে? তাই আবার আমার সাথে নাটক করছো? পারোও বটে তোমরা মেয়েরা। একবার একে চাও আবার স্বার্থ ফুরিয়ে গেলে ওকে চাও... চাও টা কি তোমরা? তোমাদের কি নিজস্ব কোন লক্ষ্য নেই? একবার এই পথ তো আর একবার ওই পথে দৌড়াও... হাপিয়ে যাও না তোমরা? (এক নিঃশ্বাসে সৌম্য বলে গেল)

প্রিয়াঙ্কা আর সহ্য করতে না পেরে কেঁদে বলে উঠল আমি প্রেগন্যান্ট।

সৌম্য পুরো চুপ, দুজনেই চুপ। পরিস্থিতি টা যেন পুরো নিস্তব্ধ হয়ে গেল হঠাৎ করে। সুচ পড়ার আওয়াজ ও যেন তীক্ষ্ণ মনে হবে। শুধু প্রিয়াঙ্কার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছে জল।

প্রিয়াংকা ফের বলল-বেবিটা তোমার। আর যাইহোক এতটা নিচে এখনো নাবতে পারিনি। তিনদিন আগে কনফার্ম হয়েছি, তিনদিন ধরে ভাবলাম কি করব বুঝে উঠতে পারছি না। তাই ভাবলাম যেহেতু বেবিটা তোমার তাই সামান্য হলেও অধিকার তোমার আছে তাই ডিসিশনটা নিতে এলাম।

সৌম্যর কিছুই বলতে পারছে না, গলা শুকিয়ে গেছে বোধহয়। এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে সেটা স্বপ্নেও ভাবেনি।

প্রিয়াঙ্কা বেশ সেটা বুঝতে পারছে তাই ব্যাপারটা সহজ করে বললো তুমি বাচ্চাটা চাও কি চাওনা সেটা জানতে এসেছি।

সৌম্য বেশ কয়েক মিনিট চুপ করে থেকে বলল দোষটা তুমি করেছ, বেবিটার কোন দোষ নেই। ও কেন তোমার হঠকারিতার শাস্তি পাবে। আবার কিছুটা চুপ থেকে সৌম্য বলল-তোমাকে রিকোয়েস্ট করছি তুমি তোমার বন্ধুর সাথে যা খুশি করো আমার কোন আপত্তি নেই শুধু বেবিটার জন্ম দিয়ে আমাকে দিয়ে দাও, আমার বাকি লাইফটা আমি ওর সাথে কাটিয়ে দিতে পারব, আর তাছাড়া তুমি তোমার ফ্রেন্ডের সাথে নতুন ঘর বাঁধবে ... ওখানে আমার বেবি ঠিক কি পরিস্থিতিতে বড় হবে সেটার কোন রকম রিস্ক আমি নিতে চাই না।

প্রিয়াংকা চুপ করে শুনলো... ওর বরাবরই সৌম্যর রুচি, চিন্তাভাবনাকে রেসপেক্ট করত, কিন্তু আজ এত কিছুর পরও সৌম্যর এই ডিসিশন প্রিয়াঙ্কাকে অবাক করে দিল, কি সরল ছেলেটা একবারও জোর করে জানতে চাইলো না সত্যিই বেবিটা ওর কিনা? রেস্পেক্ট কয়েকগুণ বেড়ে গেল প্রিয়াঙ্কার।

প্রিয়াঙ্কা ও নিজেকে সামলাতে না পেরে সৌম্যর কাছে এসে বসে সৌম্যর হাতটা নিজের দুটো হাতের মাঝে রেখে নিজের অজান্তেই সৌম্যর বুকে মাথা রেখে বলে ফেলে-সৌম্য আমরা তিনজন আবার নতুন করে শুরু করতে পারি না?

সৌম্য বেশ অবাক হল। নিজের কানকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। ওতো বরাবরই প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে ভালো থাকতে চেয়েছে।এত অন্ধকারের পর হঠাৎ সকালবেলা ওর জন্য এত বড় সারপ্রাইজ ওয়েট করছে সেটা সৌমোর কল্পনারও অতীত। সৌম্য মুখ থেকে কিছু না বলেই শুধু প্রিয়াঙ্কার হাতটা জোরে চেপে ঘাড়টা ঘুরিয়ে হুম বলল.....

সত্যিই দূরত্ব মানুষকে অনেকটা কাছে এনে দেয়, অনেক খারাপ পরিস্থিতির মিল ঘটিয়ে দেয়। আর বাচ্চা সে তো সবসময়ই ভগবানের দেয়া আশীর্বাদ হয়.... সৌম্য আর প্রিয়াঙ্কার জীবনেও বাচ্চাটা আশীর্বাদ হয়েই এসেছে। ভাবুনতো যে বাচ্চা জন্মের আগেই মা বাবাকে পাল্টে দিতে পারে সেই বাচ্চা জন্মের পর কতটা মঙ্গল ডেকে আনবে পরিবারে।

চাইলে প্রিয়াঙ্কাও বাচ্চাটা নষ্ট করে দিতে পারতো, পৃথিবীতে না আনার ডিসিশন নিতে পারত, বাচ্চাটাকে ঝামেলা মনে করতে পারতো। ভাগ্যিস করেনি..... আর করেনি বলেই তো এতো একটা সুন্দর জীবন প্রিয়াঙ্কা ফেরত পেল।

তাই কোন হঠকারিতা বা আবেগ বা আতঙ্কের বসে কোন বাচ্চাকে নষ্ট করা টা ঠিক নয়..... কে বলতে পারে ওই বাচ্চাই হয়তো একদিন আপনার বাস্তবায়িত না হওয়া স্বপ্ন বাস্তব করে দেবে... আপনার জীবন খুশির  আলোতে ভরিয়ে দেবে।