অপরিণত ভালবাসা

অপরিণত ভালবাসা

এইরে এখনই সিগন্যালটা পড়তে হলো?

আজ এমনিতেই লেট করে বেরিয়েছে সায়ন, তার উপর জ্যাম এখন আবার সিগন্যাল। বিরক্ত লাগছে সারাটা শরীর চিড়বিড় চিড়বিড় করছে। হেলমেটের তলায় ঘাম গঙ্গা-যমুনার মতো বয়ে যাচ্ছে। এক মিনিটের সিগনালে আটকেছে, তাই সায়ন হেলমেটটা খুলে রুমাল বের করে মুখটা মুছে নিচ্ছে। মুখটা রোদে পুড়ে ঝলসে বেগুন পোড়া হয়ে গেছে। বাড়ি থেকে সায়নের অফিস 23-24 কিলোমিটার মত হবে। প্রথম প্রথম গুড বয় সেজে বাসে কয়েকদিন অফিস গিয়েছিল কিন্তু ইয়ং ছেলে তো অত ঝামেলা পোষায় না, তাই বাইক নিয়েই যাতায়াত করে।যাইহোক মুখটা মুছে ভ্রু কুঁচকে এদিক-ওদিক একটু চোখটা ঘুরিয়ে নিচ্ছে সায়ন। হঠাৎ ভূত দেখার মতো চমকে উঠল...এইরে এটা কে? হেলমেট এর মধ্যে থেকে খুব ভালো বোঝা যাচ্ছে না তাও মনে হচ্ছে যেন সুতপা। বেশ ঘাড় কাত করে দেখার চেষ্টা করছে সায়ন। ও সেই মুহূর্তে ভুলে গেছে যে ও সিগনালে আটকে পড়েছে আর ওকে অফিস যেতে হবে, মনের তীব্র বাসনা এটা জানার যে ওটা সুতপাই কিনা? হ্যাঁ ওটা সুতপাই। কি মোটা হয়ে গেছে সুতপা।সায়নের বিশ্বাস করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে এ কোন সুতপা যাকে একসময় কলেজের সব ছেলেরা বাইকের পিছনে বসানোর জন্য প্রতিযোগিতা করত?সবাইকে পাস কাটিয়ে সায়ন ই জয়ী হয়ে বিশ্বকাপ থুড়ি কলেজ কাপ সুতপা কে নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিল।খুব বেশি হলে চার বছর হবে ওকে দেখেনি সায়ন এর মধ্যে এত পরিবর্তন সুতপার? জাস্ট ভাবা যায় না।

সুতপা সিগনালে ঠিক সায়নের বামদিকে ছিল,সিগন্যাল উঠে গেলে সুতপা তার স্কুটি টা স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল কিন্তু সায়ন তখনও ভাবছে রাস্তায় .... এদিকে সায়নের পিছনের গাড়ি গুলো পিপ পিপ শব্দে হর্ন দিয়ে কান ঝালাপালা করে হুশ ফেরাল সায়নের। ততক্ষনে বেশ কয়েকশো মিটার এগিয়ে গেছে সুতপা, এই ভিড়ে ওকে খুঁজে বের করা বেশ অসাধ্য ব্যাপার তাই সায়ন বৃথা চেষ্টাও করলো না। আর ওকে খুঁজেই বা কি হবে ? তবুও মানুষ তো তাই  ঘা খাওয়া বা ঘা দেওয়ার  পরও সুপ্ত বাসনা মনে থেকেই যায়... কেমন আছে ও এখন? কি করছে? বিয়ে করেছে কিনা? এইসব আরকি।

কাঁটায় কাঁটায় এগারোটায় অফিস পৌঁছাল, যাক আজ হয়তো বসের ঝাড় খেতে হবে না। নিজের কাউন্টারে গিয়ে বসে এখন প্রিপারেশন নিচ্ছে কাজ শুরু করার, এরমধ্যেই বসের কল-আজ অনেক প্রেসার আছে.. প্রয়োজনে ওভারটাইম করতে হতে পারে। সায়ন ব্যাচেলর ছেলে তাতে ওর কিছু ভ্রুক্ষেপই হলো না-এর আগেও তো কতবার হয়েছে-শুধু একটাই আফসোস তাহলে  আজ আর ক্লাবে রাতে তাস খেলাটা হবে না-যাক কি আর করা যাবে ভেবে কাজ শুরু করলো। কিন্তু ঘুরে ফিরে মনের মধ্যে সেই সুতপা-পুরনো দিন-ঘটে যাওয়া ঘটনা-কাটানো মুহূর্ত... মাইন্ড টা বারবার ডিস্টার্বড হয়ে যাচ্ছে।

2013 সালের কলেজে নবীন বরণে সুতপার প্রথম আত্মপ্রকাশ-ছিপছিপে গড়ন.. পরনে সাদা শাড়ি, পিঙ্ক ব্লাউজ, খোলা চুল, কপালে বড় একটা টিপ, গোলাপের পাপড়ির মত ঠোঁটে পিংক লিপস্টিক আর চোখে চওড়া কাজল সবার মনের মনিকোঠায় যেন আটকে গেল মেয়েটা। 500 মেয়ের মধ্যে ও যেন নজর কেড়ে নিচ্ছে সবার। সবাই ওর পেছনে সেলফির জন্য পরলো। বন্ধুদের তাতিয়ে দিয়ে সায়ন দূর থেকে বেশ মজাই নিচ্ছিল। গান নাচ করে দিনটা বেশ ভালোই কাটলো। এরপর শুরু সেই প্রতিযোগিতা ... প্রেম নিবেদনের পর প্রেম নিবেদন। খুব সুন্দরীরা সাধারণত দেমাগে ভরপুর থাকে কিন্তু সুতপা বেশ আলাপচারিতাই ছিল।সবাই পেছনে পড়ে থাকলেও সায়ন ক্যালকুলেট করে অফসাইডে খেলে সুতপার সাথে বন্ধুত্বটা পাকাপাকি করে ফেলেছিল এরপর ফোন নাম্বার আদান-প্রদান, মন আদান-প্রদানের পালা চলল।যদিও সুতপার অনেক আপত্তি ছিল কিন্তু সায়নের পাগলামির কাছে সেটা ধোপে টেকেনি, কোন কথাই শোনে নি সুতপার। পুরো কলেজ লাইফ এভাবে কাটাল ওরা। কলেজে বেশ রোমান্টিক জুটি হিসেবে পরিচিত ছিল ওরা। এভাবে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট হল।

এরপর ঝামেলাটা শুরু হল তখন, যখন চাকরির ফরম ফিলাপের জন্য বায়ো ডাটা জানাজানি হল। খুব কেঁদেছিল সেদিন সুতপা কিন্তু সায়ন কিছুতেই মানেনি।ও কিছুতেই একটা বিধবা মেয়ের সাথে সম্পর্কে এগোতে পারবে না। তখন প্রশ্ন এল পরিবার রাজি হবে না... সমাজ কি বলবে? চিরাচরিতভাবে সব দোষ গিয়ে পড়ল সুতপার ওপর কেন জানানো হয়নি এসব সায়নকে.... কিন্তু সুতপা অনবরত সায়ন কে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল অতীতের ব্যাপারে, সায়ন তখন সুতপার অতীত ঘাটতে রাজি ছিল না, বর্তমানে বিশ্বাসী ছিল। আর আজ এটা এত বড় অতীত লাগছে সায়নের কাছে? দূরে ঠেলে দিল সুতপাকে,বারংবার ফোন করার পরও সায়ন কোন যোগাযোগ রাখে নি ওর সাথে। এটাই ওদের তিন বছরের ভালোবাসার পরিণতি হলো।

এবার আসি সেই কথায়- এটা কি ছিল ? সত্যিই কি ভালোবাসা নাকি টাইম পাস নাকি ফুর্তি? কোন শব্দটা ব্যবহার করব বলতো এই সম্পর্কের জন্য? যদি ভালোবাসা বল তাহলেও একটা কথা বলি -ভাই সায়ন, সুতপার কি দোষ এতে বলবে? এমন তো নয় ও তোমাকে জানাতে চাইনি? তখন তো তুমি কলিযুগের রোমান্টিক হিরো সেজে অতীত ভুলে গিয়ে আর ভবিষ্যতের তোয়াক্কা না করেই প্রেমে ঝাপ দিয়েছিলে, শুধু তুমি না সুতপা কেউ সেই প্রেমে ডুবিয়ে দিয়েছিলে..... তাহলে আজ কেন দায়ী করছো সুতপাকে?  ভালো যখন বেসেছিলে তাহলে হাতটা ছেড়ে দিলে কেন? কঠিন অতীত জানার পর ও কি তোমার মনে হয়নি যে মেয়েটা তো জীবনে একবার সব হারিয়েছে এরপরও কি তাকে একই রকম কষ্ট দেওয়া যায়? সমাজের বিপক্ষে গিয়ে ওর হাতটা টাইট করে ধরলে হয়তো সুতপার মত মেয়েদের ভালবাসার প্রতি ঘৃণা জন্মাত না, সাহস পেত নতুন করে জীবনটা শুরু করার। আর যদি মনে করো টাইম পাস ছিল তোমার কলেজ লাইফটা তাহলে বলবো বস একটু ভেবেচিন্তে মেয়ে সিলেক্ট করো, একটু খুঁজলেই তোমার মত মেন্টালিটির মেয়েও পেয়ে যাবে। আর যদি এটাকে ফুর্তি মনে করে থাকো তাহলে তোমাকে কিছু বলার নেই...... এসব করার আগে তোমার ঘরের বোন বা দিদি টার মুখটা একবার মনে করো, তারাও তোমার মত ছেলেদের মেন্টালিটির শিকার হতে পারে, কখনো হয়তো মাঝে রাতে তাদের হৃদয় ভাঙার শব্দ  তোমাকে শুনতে হতে পারে।

জানো সবাই বলে ভালবাসার কোনো বয়স নেই,কিন্তু আমার মনে হয় ভালোবাসার পরিণতির জন্য দুটো পরিনত মনের প্রয়োজন । ভালোবাসো... আরো বেশি করে ভালোবাসো।ভালোবাসায় তো কোন অপরাধ নেই, অন্যায় নেই। ‌‌‌‌ কিন্তু ভালবাসলে সেরকম ভালোবাসো যাতে তোমার জন্য তোমার উল্টোদিকের মানুষটার চোখ থেকে জল না  ঝরে, তার হাতটা ধরে যাতে সারাটা জীবন হাসিমুখে সম্মান দিয়ে কাটাতে পারো সেই শপথ করো। সমাজের কোন প্রতিকুলতার জন্য হাতটা ছেড়ে দিও না.. একটু ধৈর্য ধরো দেখো সময় সব টা পাল্টে দেবে। এত কষ্ট করে শিক্ষা অর্জন করে মানুষের মত মানুষ হচ্ছ অথচ তোমার মনুষত্বের পরিচয় দেবে না?